সূরা আত-তালাক ৬৫:২
سُورَةُ الطَّلَاقِ · মাদানী · আয়াত ২/১২
فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍۢ وَأَشْهِدُوا۟ ذَوَىْ عَدْلٍۢ مِّنكُمْ وَأَقِيمُوا۟ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِ ۚ ذَٰلِكُمْ يُوعَظُ بِهِۦ مَن كَانَ يُؤْمِنُ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ۚ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجْعَل لَّهُۥ مَخْرَجًۭا
অনুবাদ
অতঃপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদেরকে যথোপযুক্ত পন্থায় রেখে দেবে অথবা যথোপযুক্ত পন্থায় ছেড়ে দেবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিবে। এতদ্দ্বারা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তালাকের বিধানসমূহের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মুসলিম পুরুষদের প্রতি নির্দেশনা দিচ্ছেন, বিশেষ করে যখন একটি তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত (`iddah` - তালাকের পর বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময়কাল) শেষের দিকে চলে আসে। এখানে সরাসরি আল্লাহ কথা বলছেন, এবং নির্দেশগুলো মূলত পুরুষদের জন্য, তবে শাহাদাহ (`shahadah` - সাক্ষ্য) সম্পর্কিত নির্দেশনাটি মুসলিম সমাজের সকল বিশ্বাসীর জন্য প্রযোজ্য। আয়াতের সামগ্রিক সুরটি নির্দেশনামূলক, সতর্কতামূলক এবং একইসাথে আশা ও প্রতিশ্রুতির।
অন্তিম মুহূর্তের সিদ্ধান্ত
আল্লাহ বলছেন, `فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ` (ফায়িযা বালাগনাহুন্না আজালাহুন্না), অর্থাৎ, যখন তারা তাদের নির্ধারিত সময়সীমার কাছাকাছি পৌঁছাবে। ইবন আশুর (`Ibn Ashur`) এবং আল-রাযি (`al-Razi`) এর মতো তাফসীরবিদরা ব্যাখ্যা করেন যে, এখানে `بلغن` (`balaghna` - তারা পৌঁছালো) শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ইদ্দত (`iddah`) পুরোপুরি শেষ হওয়াকে বোঝায় না, বরং ইদ্দতের শেষ প্রান্তে আসার ইঙ্গিত দেয়। এর কারণ হলো, ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার (রুজু) আর সুযোগ থাকে না। এই শব্দের ব্যবহার এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের নাজুকতাকে তুলে ধরে, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এখনো বাকি আছে, কিন্তু সময় প্রায় শেষ। এটি একটি রূপক ব্যবহার যা বোঝায় যে, সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করা যাবে না, কেননা এই সুযোগ অল্প সময়ের জন্য।
সাদরে রাখা, সসম্মানে বিদায়
আয়াতে দুটি পথ বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে: `فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍۢ` (ফাআমসিকুহুন্না বিমা‘রূফিন আও ফারিকুহুন্না বিমা‘রূফিন), অর্থাৎ, "তাদেরকে ন্যায়ানুগভাবে ফিরিয়ে রাখো অথবা ন্যায়ানুগভাবে ছেড়ে দাও।" এখানে `بِمَعْرُوفٍ` (`bi-ma'ruf` - ন্যায়ানুগভাবে বা সদয়ভাবে) শব্দটি `ইমসাফ` (ফিরিয়ে রাখা) এবং `ফারাক` (ছেড়ে দেওয়া) উভয় কাজের সঙ্গেই যুক্ত করা হয়েছে। ইবন আশুর উল্লেখ করেন যে, `ইমসাফ` হলো স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়, এবং `ফারাক` হলো তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। উভয় ক্ষেত্রেই `বিমা‘রূফিন` এর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর মানে হলো, ফিরিয়ে নিলে সুন্দর ব্যবহার, সদ্ভাব ও আপোসের মাধ্যমে রাখতে হবে, এবং ছেড়ে দিলে ভদ্রতা, সম্মান ও অধিকার পূরণের মাধ্যমে বিদায় দিতে হবে, কোনো ধরনের `ضرار` (`dirar` - ক্ষতি) করা যাবে না। জাহিলিয়্যাতের যুগে (`Jahiliyyah`) স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আবার তালাক দিয়ে ইদ্দত দীর্ঘায়িত করে কষ্ট দেওয়ার প্রথা ছিল, কুরআন এখানে সেই ধরনের `ضرার` থেকে স্পষ্ট নিষেধ করছে। এই শব্দচয়ন বৈবাহিক সম্পর্কের উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য
এরপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: `وَأَشْهِدُوا۟ ذَوَىْ عَدْلٍۢ مِّنكُمْ وَأَقِيمُوا۟ ٱلشَّهَٰدَةَ لِلَّهِ` (ওয়া আশহিদু ধাওয়া আদলিন মিনকুম ওয়া আক্বিমুশ শাহাদাতালিল্লাহ), অর্থাৎ, "এবং তোমাদের মধ্য থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ লোককে সাক্ষী রাখো, আর আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য কায়েম করো।" ইবন আশুর বলেন যে, এই আদেশ রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, বিবাদ ও ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর জন্য। `ذَوَىْ عَدْلٍۢ` (`dhaway 'adl` - দুজন ন্যায়পরায়ণ লোক) শব্দগুলো সাক্ষীর সততা ও বিশ্বস্ততার গুরুত্ব বোঝায়। আর `لِلَّهِ` (`lillah` - আল্লাহর জন্য) এই বাক্যটি সাক্ষ্যকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে স্থাপন করতে আদেশ করে, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই। এটি শুধুমাত্র একটি আইনগত প্রক্রিয়া নয়, বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার সাথে জড়িত একটি ইবাদত।
তাকওয়ার প্রতিদান
আয়াতের শেষে এই সার্বজনীন এবং অনুপ্রেরণামূলক বার্তাটি আসে: `وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجْعَل لَّهُۥ مَخْرَجًۭا` (ওয়া মান ইয়াত্তাকিল্লাহু ইয়াজ‘আল লাহু মাখরাজা), অর্থাৎ, "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সংকট থেকে) মুক্তির পথ করে দেন।" ইবন আশুর একে একটি `اعتراض` (`i'tirad` - প্রাসঙ্গিক সংযুক্তি) হিসেবে দেখেন, যা তালাকের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও তাকওয়ার (`taqwa` - আল্লাহভীতি) গুরুত্ব তুলে ধরে। `مَخْرَجًۭا` (`makhrajan` - মুক্তির পথ) শব্দটি এখানে যেকোনো বিপদ, দুশ্চিন্তা বা সংকীর্ণতা থেকে অপ্রত্যাশিত মুক্তির রূপক। আল-রাযি এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, এই `মখরজ` দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কষ্ট থেকে মুক্তি হতে পারে, এমনকি অপ্রত্যাশিত রিজিকের (`rizq` - জীবিকা) উপায়ও হতে পারে। এটি আল্লাহর একটি সার্বজনীন প্রতিশ্রুতি যে, যারা তাঁর সীমা মেনে চলে এবং তাঁকে ভয় করে, তিনি তাদের জন্য অকল্পনীয় উপায়ে সংকট থেকে পথ বের করে দেন। এই অংশে তাকওয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসার গভীর সম্পর্ক ফুটে ওঠে।
সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ২২টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
- Piety (Taqwa) (মূল আয়াত)
- Martyrdom (Shahadah) (মূল আয়াত)
- Divorce (Talaq) (মূল আয়াত)
- Divine Limits (Hudud) (মূল আয়াত)
- Trials (Ibtila)
- Appointed Term (Ajal)
- Sustenance (Rizq)
- Reliance on Allah (Tawakkul)
- Recompense (Jaza)
- Grief (Huzn)
- Preservation (Hifz)
- Delusion (Ghurur)
- Concealment (Kitman)
- Wealth (Mal)
- Salvation (Najah)
- Women (Nisa')
- Loyalty (Wala')
- Prophet Joseph (Yusuf)
- Striving (Sa'y)
- Reconciliation (Silm)
- Compromising (Mudanah)
- Justice (Adl)
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।