সূরা আর-রূম ৩০:২১
سُورَةُ الرُّومِ · মাক্কী · আয়াত ২১/৬০
وَمِنْ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَٰجًۭا لِّتَسْكُنُوٓا۟ إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةًۭ وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍۢ لِّقَوْمٍۢ يَتَفَكَّرُونَ
অনুবাদ
আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
জাগতিক আয়না
আয়াত ৩০:২১ এ আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম ক্ষমতা ও পরম অনুগ্রহের এক গভীর নিদর্শন তুলে ধরেছেন: আমাদের জীবনসঙ্গী বা `আযওয়াজ` (spouses) সৃষ্টি। এটি কেবল একটি শারীরিক মিলন নয়, বরং মানবজীবনের এক সামগ্রিক প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতার উৎস।
বিবাহের উৎস ও উদ্দেশ্য
আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, "وَمِنْ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَٰجًۭا" (`wa min aayaatihi an khalaqa lakum min anfusikum azwaajan`)। এই আয়াতে `من أنفسكم` (তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে) কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইবন আল-জাওযী উল্লেখ করেছেন, এর একটি ব্যাখ্যা হলো যে, হাওয়া (আঃ)-কে আদম (আঃ)-এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে, একটি সাধারণ ও বিস্তৃত অর্থ হলো, আল্লাহ নারীদেরকে পুরুষদের মতোই একই মানব প্রজাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন, ভিন্ন কোনো জাতি থেকে নয়। আল-মুনির (Wahba al-Zuhayli) বলেন, এই সমজাতীয়তা বা একই প্রজাতিভুক্ত হওয়া এই সম্পর্ককে `সাকিনা` (tranquility) দান করে।
এই সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো `لِّتَسْكُنُوٓا۟ إِلَيْهَا` (যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো)। সাইয়্যেদ কুতুব (Sayyid Qutb) এ প্রসঙ্গে বলেন, এই প্রশান্তি শুধু দৈহিক নয়, বরং আত্মিক, মানসিক ও স্নায়বিক এক স্থিরতা ও গভীরতা। এটি জীবনের কর্মব্যস্ততা ও চাঞ্চল্যের মাঝে এক নিরাপদ আশ্রয়। একজন পুরুষ ও একজন নারীর একীভূত হওয়ার ফলে তাদের অস্তিত্বে এক নতুন পূর্ণতা আসে, যা তাদের শরীর, আত্মা ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নির্ভরতা এনে দেয়।
ভালোবাসা ও মমতা
এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে আল্লাহ তাদের মাঝে `مَّوَدَّةًۭ وَرَحْمَةً` (ভালোবাসা ও মমতা) স্থাপন করেছেন। `مودة` মানে গভীর ভালোবাসা, আর `رحمة` মানে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া। ইবন আল-জাওযী বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে জন্মসূত্রে কোনো আত্মীয়তা না থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে এমন ভালোবাসা ও মমতা তৈরি হয়। আল-মুনির ব্যাখ্যা করেন যে, ভালোবাসা (`مودة`) প্রথমে আসে, যা ধীরে ধীরে গভীর মমতায় (`رحمة`) রূপান্তরিত হয়। এমনকি যদি শারীরিক আকর্ষণ কমেও যায়, তবুও এই মমতা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে, যা স্বামী-স্ত্রীকে জীবনের ঝড়-ঝাপটা মোকাবিলায় একে অপরের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে। এই মودة ও রহমত পারিবারিক ব্যবস্থাকে এক শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে, যা মানবজাতির অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এটি কেবল ব্যক্তিগত প্রশান্তির উৎস নয়, বরং একটি সুসংহত সমাজের ভিত্তি।
গভীর উপলব্ধির আহ্বান
আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেন, "إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَءَايَٰتٍۢ لِّقَوْمٍۢ يَتَفَكَّرُونَ" (`inna fi zaalika la'aayaatin li qawmin yatafakkaroon`) (নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে)। ইসরার আহমদ (Israr Ahmad) যেমন উল্লেখ করেছেন, এই আয়াতে ও এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে `وَمِنْ اٰیٰتِہٖٓ` এবং `اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ` এর পুনরাবৃত্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এই আয়াতটি আমাদের জীবনসঙ্গীর মধ্যে আল্লাহর সৃষ্টি কৌশল, তাঁর অসীম জ্ঞান ও ভালোবাসাকে উপলব্ধি করার জন্য উৎসাহিত করে। যারা চিন্তাভাবনা করেন, তারা এই সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা আল্লাহর কুদরত ও হেকমত বুঝতে পারেন। এটি আমাদের প্রতি আহ্বান জানায় যেন আমরা আমাদের সম্পর্কের প্রতি কৃতজ্ঞ হই, সেগুলোকে আল্লাহ প্রদত্ত এক আমানত হিসেবে দেখি এবং মودة ও রহমতের মাধ্যমে সুন্দর ও সুদৃঢ় করে তুলি।
সূত্র: Israr Ahmad (Bayan ul Quran), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), Tazkirul Quran, Ibn al-Jawzi (Zad al-Masir), al-Munir (Wahba al-Zuhayli)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ২৪টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
- Marriage (Nikah) (মূল আয়াত)
- Women (Nisa') (মূল আয়াত)
- The Family (Usrah)
- Reconciliation (Islah)
- Reflection (Tafakkur)
- Unlawful Intercourse (Zina)
- Cosmic Signs (Ayat Kawniyyah)
- Chastity (Ihsan)
- Seeking Permission (Isti'dhan)
- Compulsion (Ikrah)
- Motherhood (Umumah)
- Security (Amn)
- Man (Insan)
- Mercy (Rahmah)
- Righteousness (Birr)
- Nurturing (Tarbiyah)
- Monotheism (Tawhid)
- Sorcery (Sihr)
- Abominations (Fawahish)
- Mankind (Nas)
- Moderation (Wasatiyyah)
- Reconciliation (Silm)
- Modesty (Iffah)
- Social Relations (Alaqat Ijtima'iyyah)
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।