সূরা আল-বাকারা ২:২

سُورَةُ البَقَرَةِ · মাদানী · আয়াত ২/২৮৬

ذَٰلِكَ ٱلْكِتَٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًۭى لِّلْمُتَّقِينَ

অনুবাদ

এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য,

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

প্রিয় পাঠক, আসুন, আমরা সূরা বাকারার দ্বিতীয় আয়াত, ﴿ذَٰلِكَ ٱلْكِتَٰبُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًۭى لِّلْمُتَّقِينَ﴾ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। এটি এমন এক গ্রন্থ, যা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের কালাম, পবিত্র কুরআন সম্পর্কে ঘোষণা দিচ্ছেন। এটি কোনো সাধারণ বই নয়, বরং মানুষের জন্য দিকনির্দেশনা ও জীবন বিধান। এর প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত যত্নে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে।

উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ

আয়াতটি শুরু হয়েছে ﴿ذَٰلِكَ ٱلْكِتَٰبُ﴾ `(Dhalikal Kitāb)` – "সেটিই কিতাব" এই শব্দগুচ্ছ দিয়ে। এখানে "ذلك" `(dhalika)` ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত দূরবর্তী বস্তুকে নির্দেশ করে। অথচ কুরআন তো আমাদের সামনেই বিদ্যমান। আল্লামা ইবনে আশুর এবং আল-জালালীন উল্লেখ করেছেন যে, এই "দূরবর্তী" ইঙ্গিতটি কুরআনের উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি শুধু ভৌগোলিক বা শারীরিক দূরত্ব নয়, বরং এর গুরুত্ব, মহিমা এবং জ্ঞানের গভীরতায় এটি এতটাই সুমহান যে, এটিকে যেন হাতের নাগালের বাইরের এক উচ্চাসনে রাখা হয়েছে। এটি যেন বলছে, এই কিতাবটি এমন মহিমান্বিত যে অন্য কোনো কিতাব এর সমকক্ষ নয়। "الكتاب" `(al-Kitāb)` শব্দটি "লেখা" বা "একত্রিত করা" ধাতু থেকে এসেছে, যা নির্দেশ করে যে এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণরূপে লিখিত ও সুসংহত।

সন্দেহমুক্ত বাস্তবতা

এরপর বলা হয়েছে, ﴿لَا رَيْبَ فِيهِ﴾ `(Lā rayba fīhi)` – "এতে কোনো সন্দেহ নেই"। "ريب" `(rayb)` শব্দটি শুধু সন্দেহই নয়, বরং আত্মার অস্থিরতা ও উদ্বেগকেও বোঝায়, যেমন আল্লামা ইবনে আশুর ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে "لا" `(lā)` ব্যবহার করা হয়েছে "নফিয়ে জিনস" (জাতির সম্পূর্ণ অস্বীকার) অর্থে, যা বোঝায় যে এই কিতাবে কোনো ধরনের, কোনো প্রকারের সন্দেহের অবকাশ নেই। এটি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে, তাতে কোনো দ্বিধা থাকতে পারে না।

আল-যামাখশারী এবং আল-রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে, কেউ এর প্রতি সন্দেহ পোষণ করবে না, বরং এর অর্থ হলো, এর সত্যতা ও প্রমাণের স্পষ্টতা এমন যে, এর মধ্যে সন্দেহের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। যদি কেউ সন্দেহ করে, তবে সে তার নিজের জেদ ও অজ্ঞতার কারণেই করে। "فيه" `(fīhi)` শব্দটিকে "ريب" শব্দের পরে আনা হয়েছে, "لا فيه ريب" এর মতো করে নয়। এই ক্রমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কুরআনের মধ্যে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে, যা এর অনন্যতাকে তুলে ধরে।

পথহারাদের জন্য দিকনির্দেশনা

অবশেষে, আয়াতটি ঘোষণা করে ﴿هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ﴾ `(Hudallil muttaqīn)` – "মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ"। "هدى" `(hudā)` শব্দটি একটি مصدر (ক্রিয়ামূল), যা সাধারণত "হিদায়াত" বা "পথনির্দেশ" বোঝায়। এখানে এটিকে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা বোঝায় কুরআন নিজেই পথনির্দেশনার সারবস্তু, এটি কেবল পথনির্দেশ দানকারী নয়, বরং পথনির্দেশনার মূর্ত প্রতীক। আল্লামা ইবনে আশুর এটিকে "মুবালাগাহ" (অতিশয়োক্তি) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা কুরআনের হিদায়াতের পূর্ণতা ও গভীরতাকে তুলে ধরে।

"মুত্তাকীন" `(al-Muttaqīn)` কারা? ইবনে আশুর ও আল-রাযীর মতে, তারা হলেন যারা আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করেন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চান; যারা নিজেদেরকে মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করেন এবং তাঁর আদেশ পালন করেন ও নিষেধ থেকে দূরে থাকেন। কুরআন সমস্ত মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ হলেও, বিশেষ করে মুত্তাকীনদের জন্য এর উল্লেখের কারণ হলো, একমাত্র তারাই এর থেকে প্রকৃত উপকার লাভ করেন এবং এর আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেন। এটি তাদের জন্য আরও হিদায়াত বৃদ্ধি করে এবং তাদের তাকওয়াকে সুদৃঢ় করে।

এই আয়াতটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কুরআন একটি উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ, সন্দেহমুক্ত এবং পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ, যা কেবল তাদের জন্য ফলপ্রসূ হয়, যারা খোলা মন ও বিনম্র হৃদয় নিয়ে এর দিকে ফিরে আসে।

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন