সূরা আল-বাকারা ২:৩

سُورَةُ البَقَرَةِ · মাদানী · আয়াত ৩/২৮৬

ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِٱلْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ يُنفِقُونَ

অনুবাদ

যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সেই আল্লাহভীরু (মুত্তাকীন) লোকদের গুণাবলী বর্ণনা করছেন, যাদের জন্য কুরআনকে পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (২:২ আয়াতে)। এই তিনটি মৌলিক গুণ তাদের বিশ্বাস, ইবাদত এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্বের গভীরতা তুলে ধরে। এখানে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ এবং তার বিন্যাস থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই।

অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাস

আল্লাহ শুরুতেই বলছেন, `ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِٱلْغَيْبِ` (যারা অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে)। `يُؤْمِنُونَ` শব্দটি বর্তমান কালের ক্রিয়াপদ, যা তাদের বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা এবং দৃঢ়তা বোঝায়। ইবন আশুর (Ibn Ashur) বলেন, এর দ্বারা এই ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে তাদের বিশ্বাসে কোনো সন্দেহ নেই এবং এটি সদা সতেজ। `ٱلْغَيْبِ` (`al-Ghayb`) মানে হলো সেসব বিষয় যা আমাদের ইন্দ্রিয় বা সীমিত বুদ্ধি দিয়ে সরাসরি উপলব্ধি করা যায় না। যেমন, আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব, ফেরেশতা, পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম – এ সবই আমাদের কাছে অদৃশ্য। ইবন আশুর ব্যাখ্যা করেন যে, অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাসই অন্যান্য ঐশী বার্তা গ্রহণ করার মূলভিত্তি। যখন একজন ব্যক্তি অদৃশ্য সত্যে বিশ্বাস করে, তখন তার পক্ষে রাসূলের দাওয়াত এবং আল্লাহ তা'আলার অন্যান্য নির্দেশাবলী মেনে চলা সহজ হয়ে যায়। এটি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের হৃদয়কে প্রশস্ত করে।

সালাত প্রতিষ্ঠা

এরপর বলা হয়েছে, `وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ` (এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে)। `يُقِيمُونَ` শব্দটি কেবল সালাত আদায় করার চেয়েও বেশি কিছু নির্দেশ করে। ইবন আশুর বলেন, এর অর্থ হলো কোনো কিছুকে সুদৃঢ় করা বা সক্রিয় রাখা। এর মানে হলো, কেবল সালাত পড়া নয়, বরং নিয়মিত, যত্ন সহকারে এবং পরিপূর্ণভাবে সালাতের সমস্ত রীতিনীতি ও শর্তাবলী মেনে চলা। আল-রাযি (al-Razi) ও আল-যামাখশারী (al-Zamakhshari) উভয়েই উল্লেখ করেছেন যে `ইক্বামাহ` (`iqamah`) (প্রতিষ্ঠা করা) বলতে সালাতের স্তম্ভগুলোকে ঠিকভাবে আদায় করা এবং সেগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়াকে বোঝায়। এই ক্রিয়াপদের বর্তমান কাল ব্যবহার বোঝায় যে এটি একটি চলমান এবং স্থিতিশীল অভ্যাস। `الصَّلَوٰةَ` (`as-Salah`) শব্দটি আরবিতে দু'আ বা বিনয় থেকে এসেছে, কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় এটি একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত, যার মধ্যে কিয়াম, রুকু, সিজদা এবং অন্যান্য কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা হয়। কুরআনে `الصَّلَوٰةَ` শব্দটি 'ওয়াও' (و) দিয়ে লেখার পেছনে একটি সূক্ষ্ম ভাষাগত ইঙ্গিত রয়েছে, যা এর মূল অভিধানিক অর্থের দিকে নির্দেশ করে, যদিও এটি 'আলিফ' (ا) এর মতো উচ্চারিত হয়।

প্রদত্ত সম্পদ থেকে ব্যয়

আয়াতের শেষ অংশ হলো, `وَمِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ يُنفِقُونَ` (এবং আমরা তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে)। এখানে `مِمَّا` (`mimma`) শব্দটিতে ব্যবহৃত `مِنَ` (মিন) আংশিকতা বা 'কিছু অংশ' বোঝায়। ইবন আশুর এবং আল-রাযি ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর দ্বারা বোঝা যায় মুত্তাকীনরা তাদের সব সম্পদ ব্যয় করে না, বরং যতটুকু তাদের জন্য সহজ এবং শরিয়ত নির্দেশ করে, তা থেকে ব্যয় করে। ইসলাম মানুষকে অতিরিক্ত বোঝা চাপায় না এবং অপচয় ও অপব্যয় থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়।

`رَزَقْنَٰهُمْ` (`razaqnāhum`) শব্দটিতে আল্লাহ নিজেই রিজিকের উৎস হিসেবে নিজেকে উল্লেখ করেছেন। এটি বিশ্বাসীদের মনে করিয়ে দেয় যে তাদের সমস্ত সম্পদ আল্লাহর দান এবং তারা কেবল তার রক্ষক। আল-রাযি ও ইবন আশুর `আহলুস সুন্নাহ`-এর মতানুযায়ী ব্যাখ্যা করেন যে, 'রিজিক' আভিধানিকভাবে হালাল (বৈধ) ও হারাম (অবৈধ) উভয় প্রকারের অর্জনকে অন্তর্ভুক্ত করে, কিন্তু আল্লাহ কেবল পবিত্র ও হালাল উৎস থেকে করা ব্যয়ই গ্রহণ করেন।

এই অংশে শব্দের বিন্যাস `وَمِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ يُنفِقُونَ` বিশেষভাবে লক্ষণীয়। "আমরা তাদের যা রিজিক দিয়েছি" (مِمَّا رَزَقْنَٰهُمْ) অংশটি "তারা ব্যয় করে" (يُنفِقُونَ) ক্রিয়াপদের আগে এসেছে। ইবন আশুর ও আল-রাযি উল্লেখ করেছেন যে, এই বিন্যাসটি গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মুত্তাকীনরা তাদের সেই সম্পদ থেকে ব্যয় করে যা তাদের কাছে মূল্যবান এবং যা আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করে তাদের দান করেছেন। এই বিন্যাসটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর পথে ব্যয় করার জন্য ত্যাগ স্বীকারের মনোভাবকে তুলে ধরে। `يُنفِقُونَ` ক্রিয়াপদটিও বর্তমান কাল, যা আল্লাহর পথে নিয়মিতভাবে ব্যয় করার একটি স্থায়ী অভ্যাসকে বোঝায়।

এই তিনটি গুণ – অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাস, সালাত প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করা – পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একজন মুত্তাকীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। এটি হৃদয়ের বিশ্বাস, শারীরিক ইবাদত এবং আর্থিক ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের প্রতিফলন।

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১২টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন