সূরা আল-বাকারা ২:১
سُورَةُ البَقَرَةِ · মাদানী · আয়াত ১/২৮৬
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ الٓمٓ
অনুবাদ
আলিফ লাম মীম।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
সুরা বাকারার শুরুতেই আমরা পবিত্র কুরআন শরিফের এমন কিছু আয়াত পাই যা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে: `بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ` এরপর আসে `الٓمٓ` (আলিফ-লাম-মীম)। এই অক্ষরগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা আল্লাহর কালামের অসীম প্রজ্ঞা অনুভব করি।
`الٓمٓ` কী বোঝায়?
এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো (`الحروف المقطعة`) প্রথম দেখায় কিছুটা রহস্যময় মনে হতে পারে। মুফাসসিরগণ (কুরআনের ব্যাখ্যাকারীরা) এর অর্থ নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন। `al-Muyassar` এর সরল অর্থ অনুযায়ী, এই অক্ষরগুলো এবং অন্যান্য সূরার শুরুতে আসা এ ধরনের অক্ষরগুলো কুরআনের অলৌকিকতার প্রতি ইঙ্গিত করে। এগুলো মুশরিকদের (অবিশ্বাসীদের) চ্যালেঞ্জ করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু তারা এর মোকাবেলা করতে পারেনি।
ইবনে আশুর এবং জামাখশারির মতো অনেক পণ্ডিতের মতে, `الم` কোনো শব্দ নয়, বরং আলিফ, লাম এবং মীম – এই তিনটি অক্ষরের নাম। যখন আমরা এটি পড়ি, তখন আমরা "আ-লাম" না বলে "আলিফ-লাম-মীম" বলি। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইশারা, যা আমাদের এই কালামের গভীরে প্রবেশ করতে উৎসাহিত করে।
কুরআনের অলৌকিকতা
মুফাসসিরদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মত হলো, এই অক্ষরগুলো মক্কার মুশরিকদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কুরআন তাদের দৈনন্দিন ভাষার অক্ষর (`حروف الهجاء`) দিয়েই গঠিত, যেমন `الم`। এই সাধারণ অক্ষরগুলো ব্যবহার করেই আল্লাহ এমন এক কিতাব নাজিল করেছেন, যা মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় এবং যার মতো কিছু তৈরি করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। ইবনে আশুর এই মতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ এটি প্রমাণ করে যে, এমনকি তাদের নিজস্ব ভাষার অক্ষর দিয়ে গঠিত হলেও তারা কুরআনের মতো কিছু তৈরি করতে অক্ষম ছিল। এটি তাদের দুর্বলতা তুলে ধরে এবং আল্লাহর বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।
আল-রাযীও উল্লেখ করেছেন যে, এই অক্ষরগুলো মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অবিশ্বাসীরা যখন কুরআন শুনতে চাইত না, তখন এই অক্ষরগুলো শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে মনোযোগ দিত এবং পরবর্তী আয়াতগুলো শুনতে বাধ্য হতো। এভাবে আল্লাহর কালাম তাদের কানে পৌঁছাতো, যা তাদের হেদায়েতের পথ খুলে দিত।
আল্লাহর সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা
জামাখশারি তার তাফসীরে `الم` এর মতো অক্ষরগুলোর পেছনে আল্লাহর সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা (`حكمة`) তুলে ধরেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোরআনে ব্যবহৃত এই বিচ্ছিন্ন অক্ষরগুলো আরবি বর্ণমালার অর্ধেকের সমান এবং সেগুলো অক্ষরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য (যেমন, জোর দিয়ে উচ্চারিত, মৃদু উচ্চারিত, শক্ত বা নরম) এর অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব করে। এটি ইঙ্গিত করে যে, এই অক্ষরগুলোর বিন্যাসের মধ্যেও এমন অলৌকিকতা এবং সৌন্দর্য রয়েছে যা শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন। এটি মানবজাতিকে মনে করিয়ে দেয় যে, কুরআনের প্রতিটি অংশ, এমনকি এর অক্ষরগুলিও আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর বহন করে।
আমাদের জন্য এটি একটি গভীর শিক্ষা। `الم` এর রহস্যময়তা আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়, আল্লাহর জ্ঞানের সামনে আমাদের সীমাবদ্ধতা মনে করিয়ে দেয়। এর অলৌকিকতা আমাদের কুরআনের প্রতি বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে। এই অক্ষরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর কালাম কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়, বরং তা এমন এক ঐশ্বরিক বার্তা, যা আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং জীবনকে নতুন আকার দিতে সক্ষম।
সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।