সূরা আল-ফাতিহা ১:২

سُورَةُ ٱلْفَاتِحَةِ · মাক্কী · আয়াত ২/৭

ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ

অনুবাদ

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

পবিত্র কুরআনের এই দ্বিতীয় আয়াতে আমরা আল্লাহর দিকে আমাদের হৃদয়ের সম্পূর্ণ মনোযোগ ফিরিয়ে আনি, যাঁর প্রশংসা দিয়ে আমরা আমাদের রবকে স্মরণ করা শুরু করি। এই আয়াতটি নিছক একটি তথ্য নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রার্থনা এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করার একটি নির্দেশনা। আল্লাহ তাআলা নিজেই আমাদেরকে শেখাচ্ছেন কীভাবে তাঁর প্রশংসা করতে হয়, যা তাঁর বান্দাদের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং তাঁর মাহাত্ম্য স্বীকারের একটি পথ।

‘আলহামদু’ শব্দের গভীরতা

আয়াতটি শুরু হয়েছে `ٱلْحَمْدُ` (`Al-Hamdu`) দিয়ে, যার অর্থ ‘সকল প্রশংসা’। ভাষাগতভাবে, `الحمد` শব্দটি `الشكر` (`Shukr`, কৃতজ্ঞতা) থেকে ভিন্ন। আল-যামাখশারী এবং ইবন আশুর ব্যাখ্যা করেন যে, `الشكر` কেবল অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, কিন্তু `الحمد` কেবল অনুগ্রহের জন্য নয়, বরং যে কোনো সুন্দর গুণ বা কাজের জন্য প্রশংসা বোঝায়। যেমন, আমরা আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলীর প্রশংসা করি, যদিও তা সরাসরি আমাদের প্রতি কোনো অনুগ্রহ না-ও হতে পারে। এটি `الشكر` এর চেয়ে ব্যাপক এবং উচ্চতর অর্থ বহন করে।

`الحمد` শব্দের শুরুতে যে `আল-` (ال) রয়েছে, তা শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রশংসা বোঝায় না, বরং প্রশংসার পুরো প্রজাতি বা প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মানে হলো, যত ধরনের প্রশংসা হতে পারে, সবটুকুই কেবল আল্লাহর জন্য। `আল-` (ال) যোগ করার ফলে এই প্রশংসা স্থায়ী ও অবিচল হয়, যা আল্লাহ তাআলার চিরন্তন গুণাবলীর প্রতি ইঙ্গিত করে। ইবন আশুর এবং আল-যামাখশারী উল্লেখ করেছেন যে, এই বাক্যটি (`الْحَمْدُ لِلَّهِ`) একটি নামবাচক বাক্য, যা সাধারণত কোনো অবস্থা বা গুণের স্থায়িত্ব বোঝায়। যদি এটি ক্রিয়াবাচক হতো (যেমন: `نَحْمَدُ اللَّهَ حَمْدًا`), তবে তা কেবল সাময়িক বা নির্দিষ্ট সময়ের প্রশংসা বোঝাত। কিন্তু নামবাচক হওয়ায় এটি বোঝায় যে, প্রশংসা সর্বদা আল্লাহর জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত ও তাঁরই প্রাপ্য।

আয়াতের শুরুতে `الحمد` শব্দটি স্থাপন করা হয়েছে আল্লাহর নামের চেয়েও আগে, যা একটি বিশেষ গুরুত্ব বোঝায়। যদিও আল্লাহর নাম স্বয়ং সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এই আয়াতে `الحمد` কে আগে আনা হয়েছে কারণ প্রারম্ভিক এই মুহূর্তে প্রশংসার বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতির চাহিদা। এটি আল্লাহর প্রতি আমাদের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার প্রাথমিক প্রকাশ।

‘লিল্লাহি’ শব্দের বৈশিষ্ট্য

`لِلَّهِ` (`Lillahi`) শব্দটির মাধ্যমে `আল-হামদু` (সকল প্রশংসা) একচেটিয়াভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। `الله` (`Allah`) শব্দটি আল্লাহর একচ্ছত্র নাম, যা তাঁর পবিত্র সত্তার পরিচয়। এটি কোনো সাধারণ গুণবাচক নাম নয়, বরং এমন একটি নাম যা তাঁর সকল পূর্ণ গুণাবলী ও অস্তিত্বের অপরিহার্যতাকে নির্দেশ করে। ইবন আশুর ব্যাখ্যা করেন যে, এই শব্দটি `الإله` (`Al-Ilah` অর্থাৎ উপাস্য) থেকে এসেছে, যা ব্যাপক ব্যবহারের কারণে সংক্ষিপ্ত হয়ে `الله` হয়েছে। `الله` বলার সময় এর `লাম` (`lam`) বর্ণকে মোটা করে উচ্চারণ করা হয় (তাফখিম), যা এই নামের অনন্যতা ও মহিমাকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

‘রব্বিল আলামীন’ এর অর্থ ও তাৎপর্য

এরপর আল্লাহ তাআলা নিজেকে `رَبِّ الْعَالَمِينَ` (`Rabbil 'Alamin`) অর্থাৎ ‘সৃষ্টিকুলের রব’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। `রব` (`Rabb`) শব্দটি কেবল ‘মালিক’ (owner) বা ‘শাসক’ (ruler) নয়। ইবন আশুর উল্লেখ করেন, `রব` এর মূল অর্থ হলো লালন-পালনকারী, যিনি প্রতিটি জিনিসকে তার পরিপূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছে দেন। তিনি শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি, বরং তাদের যাবতীয় ব্যাপার পরিচালনা করেন, তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন এবং ক্রমবিকাশের মাধ্যমে তাদের উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেন। এই অর্থটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি আল্লাহর সার্বক্ষণিক যত্ন এবং তত্ত্বাবধানের ইঙ্গিত দেয়। পরবর্তী আয়াতে `مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ` (`Maliki Yawmid-Din`, বিচার দিবসের মালিক) আসার কারণে, `রব` কে এখানে ‘মালিক’ অর্থে না নিয়ে ‘প্রতিপালক’ অর্থে নেওয়া হয়েছে, যা অর্থের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সাহায্য করে এবং আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলীকে আলাদাভাবে তুলে ধরে।

`العالمين` (`Al-'Alamin`) শব্দের মাধ্যমে সব ধরনের সৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে: মানুষ, জিন, ফেরেশতা, প্রাণীজগত এবং অন্যান্য যা কিছু দ্বারা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। আল-যামাখশারী এবং ইবন আশুর বলেছেন যে, `عالم` (`'alam`) শব্দটি `علم` (`ilm`, জ্ঞান) অথবা `علامة` (`alamah`, চিহ্ন) থেকে উদ্ভূত, কারণ প্রতিটি সৃষ্টিই তার সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও ক্ষমতার প্রমাণ বা চিহ্ন। `العالمين` শব্দটিকে পুরুষবাচক বহুবচনে ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও এতে মানুষ ছাড়া অন্য সৃষ্টিও অন্তর্ভুক্ত। এটি আরবী ভাষার একটি রীতি, যেখানে বুদ্ধিমান প্রাণীদেরকে অন্যান্য সৃষ্টির উপর প্রাধান্য দিয়ে এভাবে বহুবচন করা হয়, যা সব সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর প্রতিপালকত্বের ব্যাপকতা ও সর্বজনীনতা বোঝায়।

এইভাবে, `ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ` আয়াতে শব্দচয়ন, বাক্য গঠন এবং ব্যাকরণগত বিন্যাস আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আমাদের প্রশংসা ও আনুগত্যের গভীরতা অনুধাবন করতে শেখায়। এটি আল্লাহর চিরন্তন মহিমা, তাঁর প্রতিপালকত্বের পূর্ণতা এবং তাঁর প্রতি আমাদের নিবেদনের একটি সুন্দর ঘোষণা।

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৯টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন