সূরা সাবা ৩৪:১৩
سُورَةُ سَبَإٍ · মাক্কী · আয়াত ১৩/৫৪
يَعْمَلُونَ لَهُۥ مَا يَشَآءُ مِن مَّحَٰرِيبَ وَتَمَٰثِيلَ وَجِفَانٍۢ كَٱلْجَوَابِ وَقُدُورٍۢ رَّاسِيَٰتٍ ۚ ٱعْمَلُوٓا۟ ءَالَ دَاوُۥدَ شُكْرًۭا ۚ وَقَلِيلٌۭ مِّنْ عِبَادِىَ ٱلشَّكُورُ
অনুবাদ
তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউযসদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করত। হে দাউদ পরিবার! কৃতজ্ঞতা সহকারে তোমরা কাজ করে যাও। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর পরিবার, অর্থাৎ `আলে দাউদ` (`aal Dawood`) কে সম্বোধন করে কথা বলছেন। পরিস্থিতি হলো, আল্লাহ জীনদের মাধ্যমে সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-কে যেসব বিশাল কর্ম করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যেমন প্রাসাদ নির্মাণ ও বিশাল ভোজের আয়োজন, সেগুলোর বর্ণনা দেওয়ার পর আল্লাহ তাঁদেরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর অল্প সংখ্যক বান্দাই প্রকৃত কৃতজ্ঞ।
শব্দচয়ন ও এর গভীরতা
এই আয়াতে ব্যবহৃত শব্দগুলো সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-কে প্রদত্ত ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার অসাধারণ ব্যাপ্তি তুলে ধরে।
প্রথমত, `محاريب` (`mahaareeb`) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা দ্বারা বোঝানো হয়েছে উচুঁ, সুদৃঢ় দালান বা প্রাসাদ। আল-রাযী (রহিমাহুল্লাহ) এটিকে "উঁচু ইমারত" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইবন আশুর (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন যে, এর মূল অর্থ দুর্ভেদ্য দুর্গ বা প্রাসাদ, যা পরে ইবাদতের নির্জন স্থানের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দচয়ন সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর রাজকীয় ক্ষমতা ও জীনদের দ্বারা নির্মিত বিশাল স্থাপনার ইঙ্গিত দেয়।
এরপর `تماثيل` (`tamaatheel`) শব্দটির উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাধারণত চিত্র বা মূর্তি বোঝায়। আল-জালালাইন (রহিমাহুল্লাহ) ব্যাখ্যা করেন যে, এগুলো তামা, কাঁচ বা মার্বেল পাথরের তৈরি বিভিন্ন ছবি বা মূর্তি ছিল এবং সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর শরীয়তে এগুলো তৈরি করা হারাম ছিল না, যদিও পরবর্তী শরীয়তে (ইসলামে) তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল-যামাখশারী (রহিমাহুল্লাহ) এই ছবিগুলোকে ফেরেশতা, নবী বা সৎকর্মশীলদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে জায়েজ ছিল।
`جفان كالجواب` (`jifaan kal-jawaab`) বাক্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। `জ্বিফান` হলো বড় বড় খাবারের বাটি, আর `জাওয়াব` হলো বিশাল জলাধার বা চৌবাচ্চা। এই উপমাটি বোঝায় যে, খাবারের বাটিগুলো এতটাই বিশাল ছিল যে, সেগুলো দেখতে জলাধারের মতো মনে হতো। আল-রাযী এবং ইবন আশুর (রহিমাহুমুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন যে, একটি বাটিতে এক হাজার মানুষ পর্যন্ত খেতে পারতো। এটি সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও কর্মচারীদের জন্য বিশাল ভোজের আয়োজনের চিত্র তুলে ধরে।
এবং `قدور راسيات` (`qudoor raasiyaat`) মানে "বিশাল, স্থির ডেগচি"। আল-রাযী (রহিমাহুল্লাহ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এগুলো এতটাই বড় ছিল যে, স্থানান্তরিত করা যেত না, বরং যেখানে রাখা হতো সেখানেই রান্না করা হতো। এই শব্দগুলো দিয়ে বোঝা যায় রান্নার পাত্রগুলো কত বিশাল এবং কত ব্যাপক পরিসরে রান্না করা হতো। আল-রাযী `mahaareeb` এর পর `tamaatheel` এবং `jifaan` এর পর `qudoor` উল্লেখ করার পেছনে একটি সূক্ষ্ম কারণ বলেছেন: প্রথমে বাসস্থান এবং তার সাজসজ্জা, তারপর খাবারের মেহমানদারির বিশালতা তুলে ধরার জন্য পরিবেশনের পাত্র (বাটি) এবং তারপর সেই খাবার রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় পাত্র (ডেগচি)। এই শব্দক্রম সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর ঐশ্বর্য এবং জীবনযাত্রার আড়ম্বরকে চমৎকারভাবে প্রকাশ করে।
কর্মের উদ্দেশ্য: কৃতজ্ঞতা
আল্লাহ এরপর `اعملوا آل داوود شكراً` (`e'maloo aala Dawood shukran`) বলে নির্দেশ দিচ্ছেন, অর্থাৎ "হে দাউদের পরিবার, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কাজ কর।" এখানে `شكراً` (`shukran`) শব্দটি একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আল-রাযী এবং ইবন আশুর (রহিমাহুমুল্লাহ) এর বিভিন্ন ব্যাকরণগত তাৎপর্য তুলে ধরেছেন, যার সারমর্ম হলো, তোমাদের কর্মগুলো যেন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হয়। অর্থাৎ, কর্ম শুধু কর্ম নয়, বরং তা হতে হবে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি শুকরিয়াস্বরূপ। এটি কেবল মুখে বলা শুকরিয়া নয়, বরং জীবন দিয়ে, কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ।
শিক্ষণীয় বিষয়
আয়াতটি শেষ হয় `وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِىَ ٱلشَّكُورُ` (`wa qaleelun min 'ibadiya ash-shakoor`) বাক্য দিয়ে, যার অর্থ "আমার বান্দাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই প্রকৃত কৃতজ্ঞ"। এখানে `الشكور` (`ash-shakoor`) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ `শাকির` (কৃতজ্ঞ) এর চেয়ে বেশি, এর অর্থ "অত্যন্ত কৃতজ্ঞ" বা "প্রচুর কৃতজ্ঞ"। আল-যামাখশারী (রহিমাহুল্লাহ) এর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, প্রকৃত কৃতজ্ঞ সে, যে সব অবস্থায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা কেবল মৌখিক নয়, বরং অন্তর, জিহ্বা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে নিরন্তর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, যা খুবই বিরল। সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর পরিবারকে এত বিশাল নেয়ামত সত্ত্বেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ এবং তারপর এই উক্তি, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর অগণিত নেয়ামতের জন্য প্রকৃত কৃতজ্ঞ হওয়া কত কঠিন এবং কত জরুরি। আমাদের কর্মের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহকে ধন্যবাদ জানানো এবং এই বিরল কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা।
সূত্র: al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ১৯টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
- Prophet Solomon (Sulayman) (মূল আয়াত)
- Deeds (Amal) (মূল আয়াত)
- Gratitude (Shukr) (মূল আয়াত)
- Civilization (Hadarah)
- Blessings (Ni'am)
- Economy (Iqtisad)
- Subservience (Taskhir)
- Voluntary Acts (Tatawwu)
- Empowerment (Tamkin)
- Mountains (Jibal)
- The Jinn
- The Foul (Khabith)
- Praise (Hamd)
- Seeing Allah (Ru'yah)
- Strength (Quwwah)
- Praise (Madh)
- Worship (Ibadah)
- Justice (Adl)
- Rivers (Anhar)
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।