সূরা আল-বাকারা ২:১৯

سُورَةُ البَقَرَةِ · মাদানী · আয়াত ১৯/২৮৬

أَوْ كَصَيِّبٍۢ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ فِيهِ ظُلُمَٰتٌۭ وَرَعْدٌۭ وَبَرْقٌۭ يَجْعَلُونَ أَصَٰبِعَهُمْ فِىٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَٰعِقِ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ ۚ وَٱللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَٰفِرِينَ

অনুবাদ

আর তাদের উদাহরণ সেসব লোকের মত যারা দুর্যোগপূর্ণ ঝড়ো রাতে পথ চলে, যাতে থাকে আঁধার, গর্জন ও বিদ্যুৎচমক। মৃত্যুর ভয়ে গর্জনের সময় কানে আঙ্গুল দিয়ে রক্ষা পেতে চায়। অথচ সমস্ত কাফেরই আল্লাহ কর্তৃক পরিবেষ্ঠিত।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

এই আয়াতে আল্লাহ মুনাফিকদের (hypocrites) অবস্থা তুলে ধরেছেন আরেকটি প্রাণবন্ত উপমার মাধ্যমে। এটি তাদের মনের দোলাচল, বিভ্রান্তি এবং ভয়ের এক চমৎকার চিত্রায়ন। প্রথম আয়াতে তাদের আলোর অভাবে পথ হারানোর কথা বলা হয়েছিল, আর এখানে বলা হয়েছে এক প্রচণ্ড দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তাদের অসহায়ত্বের কথা।

উপমার সূচনা

আয়াতটি শুরু হয়েছে `أَوْ كَصَيِّبٍ` (আও কাসাইয়্যিবিন) দিয়ে, যার অর্থ "অথবা যেন এক প্রবল বৃষ্টিধারার মতো"। এখানে `أَوْ` (আও) শব্দটি বোঝায় যে এটি আগের উপমার বিকল্প নয়, বরং মুনাফিকদের অবস্থার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরছে, যা একই রকম গভীর এবং অর্থপূর্ণ। `صَيِّبٍ` (সাইয়্যিব) শব্দটি একটি বিশেষ ধরনের প্রবল বৃষ্টিকে বোঝায়, যা তীব্র ও ভয়াবহ। আল-রাযী (al-Razi) ও জামাখশারী (al-Zamakhshari) উল্লেখ করেছেন যে, এই অনির্দিষ্টকরণ (`نكرة`) বৃষ্টির তীব্রতা ও ভয়াবহতার দিকে ইঙ্গিত করে, যেমন আগের আয়াতে `نارٍ` (নার) শব্দটি অগ্নির ভয়াবহতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছিল। `مِّنَ ٱلسَّمَآءِ` (মিনাস সামা ই) অর্থাৎ "আকাশ থেকে" - এই অংশটি বৃষ্টির উৎসকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে, যেন এর ভয়াবহতাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

আঁধার, বজ্র ও বিদ্যুৎ

এরপর বলা হয়েছে `فِيهِ ظُلُمَٰتٌۭ وَرَعْدٌۭ وَبَرْقٌۭ` (ফিহি জুলুমাতুন ওয়া রা'দুন ওয়া বারকুন) – "তাতে রয়েছে গভীর অন্ধকার, বজ্র ও বিদ্যুৎ।" এখানে `ظُلُمَٰتٌۭ` (জুলুমাতুন) শব্দটি বহুবাচক, যার দ্বারা রাতের অন্ধকার, ঘন মেঘের অন্ধকার এবং বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট অন্ধকার - এই তিন স্তরের সম্মিলিত অন্ধকারকে বোঝানো হয়েছে। আল-রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটি মুনাফিকদের জীবনে ধর্ম ও দুনিয়া সম্পর্কিত ব্যাপক বিভ্রান্তি এবং সন্দেহের গভীরতাকে তুলে ধরে। এর বিপরীতে `رَعْدٌۭ` (রা'দুন - বজ্র) এবং `بَرْقٌۭ` (বারকুন - বিদ্যুৎ) একক শব্দে এসেছে। বজ্র দ্বারা কুরআনের সতর্কবাণী ও ভীতি প্রদর্শনকে বোঝানো হয়েছে, আর বিদ্যুৎ দ্বারা কখনও কখনও সত্যের ঝলক বা পথের নির্দেশিকাকে চিত্রিত করা হয়েছে, যা মুনাফিকরা কখনো সখনো উপলব্ধি করে।

মৃত্যুর ভয়ে কান বন্ধ করা

আয়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো `يَجْعَلُونَ أَصَٰبِعَهُمْ فِىٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَٰعِقِ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ` (ইয়ায'আলুনা আসাবি'আহুম ফি আযানিম মিনাস সাওয়া'ইক্বি হাযারাল মাউত) – "তারা বজ্রপাতের ভয়ে মৃত্যুভয়ে নিজেদের আঙ্গুল কানে ঢুকিয়ে দেয়।" এখানে `أَصَٰبِعَهُمْ` (আসাবি'আহুম - আঙ্গুল) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যদিও তারা মূলত আঙ্গুলের ডগা (`أنامل`) প্রবেশ করায়। জামাখশারী ও আল-রাযী বলেছেন, এটি তাদের চরম ভয় এবং প্রচণ্ড শব্দ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার রূপক, যা মুনাফিকদের কুরআনের কঠোর সতর্কবাণী এবং পরিণতি থেকে বাঁচার মরিয়া চেষ্টা চিত্রিত করে। `الصَّوَاعِقِ` (আস-সাওয়া'ইক্বি - বজ্রপাত) হচ্ছে বজ্রসহ পতিত অগ্নিশিখা, যা মারাত্মক ধ্বংসাত্মক। এটি মুনাফিকদের জন্য আসা পার্থিব বিপদ, শাস্তি ও ফিতনাকে বোঝায়। `حَذَرَ ٱلْمَوْتِ` (হাযারাল মাউত - মৃত্যুর ভয়ে) তাদের এই কাজের পেছনের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে তোলে: নিছক ভয় নয়, বরং অস্তিত্ব বিলীনের ভয়।

আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতা

শেষে আল্লাহ তাআলা বলেন `وَٱللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَٰفِرِينَ` (ওয়াল্লাহু মুহীত্বুম বিল কাফিরীন) – "আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" এই বাক্যটি একটি স্বাধীন ঘোষণা বা মন্তব্য (ইবন আশুর এটিকে `اعتراض` বা 'ইতরাহ' বলেছেন) যা মুনাফিকদের প্রতি চূড়ান্ত সতর্কবাণী। `مُحِيطٌۢ` (মুহীত্ব) শব্দটি অত্যন্ত শক্তিশালী, যা আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতা ও জ্ঞানকে বোঝায়। এর অর্থ হলো, কাফিররা আল্লাহর হাত থেকে পালাতে পারবে না, তার জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরে যেতে পারবে না, বা তার হিসাব থেকে রক্ষা পেতে পারবে না। তাদের সব মরিয়া চেষ্টা ব্যর্থ, কারণ আল্লাহ তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি চিন্তা দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। এই কথাটি মুনাফিকদের প্রতি এক নিদারুণ হুমকি, যা তাদের ভণ্ডামির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Jalalayn

কুরআনিক জগত

"মা'আনি এআই" হিসেবে, আসুন আমরা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৯ নং আয়াতটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। এটি আল্লাহ তায়া'লার কথা, তাই বিনয়, শ্রদ্ধা এবং খোলা মন নিয়ে এর কাছে যাই, যাতে এটি আমাদের অন্তরকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।

আয়াতে কে কার কথা বলছেন?

এই আয়াতটি মুনাফিকদের (ভণ্ড মুসলিম) সম্পর্কে, যারা প্রকাশ্যে মুসলিম বলে দাবি করত, কিন্তু তাদের অন্তরে ছিল অবিশ্বাস। আল্লাহ তায়া'লা এই আয়াতে তাদের দ্বিধাগ্রস্ত ও ভীতু মনের অবস্থা তুলে ধরছেন। এটি মদীনার সময়ে অবতীর্ণ, যখন মুসলিমদের মাঝে মুনাফিকদের উপস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাধ্যমে অন্তরের ছবি

এই আয়াতে আল্লাহ একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাধ্যমে মুনাফিকদের মানসিক অবস্থাকে চিত্রিত করেছেন:

أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ فِيهِ ظُلُمَٰتٌۭ وَرَعْدٌۭ وَبَرْقٌۭ يَجْعَلُونَ أَصَٰبِعَهُمْ فِىٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَاعِقِ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ ۚ وَٱللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَٰفِرِينَ

এর অর্থ হলো: "অথবা (তাদের উদাহরণ) আকাশ থেকে নেমে আসা প্রবল বৃষ্টির মতো, যাতে রয়েছে গাঢ় অন্ধকার, বজ্রের গর্জন এবং বিদ্যুৎ চমক। তারা বজ্রপাত থেকে মৃত্যুর ভয়ে তাদের আঙুল কানে ঢুকিয়ে দেয়। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।"

এখানে `صَيِّبٍ` (`sayyib`) মানে হলো প্রবল বৃষ্টি, যেমন মুফতি শফি এবং ইমাম তাবারী ব্যাখ্যা করেছেন। এই বৃষ্টি আল্লাহর রহমত ও জীবনদায়ী হলেও, এখানে তা ভয়াবহ পরিবেশের অংশ। মুনাফিকরা ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারলেও, জাগতিক স্বার্থ তাদের দোদুল্যমান রাখে, ঠিক যেন মানুষ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টিতে আটকে পড়েছে।

আকাশে `ظُلُمَاتٌ` (`dhulumat`) বা গাঢ় অন্ধকার, যা অবিশ্বাস, সন্দেহ ও কপটতার অন্ধকারকে বোঝায়, যেমন ইমাম ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন। এই অন্ধকার কেবল মেঘের নয়, রাতের অন্ধকার এবং বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট অন্ধকারও এর সঙ্গে যুক্ত (যেমন ইমাম রাযী বলেন)।

এরপর আসে `رَعْدٌ` (`ra'd`) বা বজ্রের গর্জন। এর আওয়াজ অন্তরে ভয় জাগায়। অনেক মুফাসসির, যেমন হযরত আলী (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.), এটিকে মেঘ পরিচালনাকারী ফেরেশতার আওয়াজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই গর্জন মুনাফিকদের অন্তরে ইসলামের শাস্তি বা পরিণতি নিয়ে তৈরি হওয়া ভয়কে তুলে ধরে।

আর রয়েছে `بَرْقٌ` (`barq`) বা বিদ্যুৎ চমক। এটি মুহূর্তের জন্য আলো দেখায়, যেন সত্যের এক ঝলক বা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত জাগতিক কোনো সুবিধা (যেমন বিজয় বা গনীমত) বোঝায়।

মৃত্যুভয় ও আল্লাহর পরিবেষ্টন

প্রবল `صَوَاعِقِ` (`sawa'iq`) বা বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য তারা `يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِىٓ آذَانِهِم مِّنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ` অর্থাৎ "মৃত্যু ভয়ে কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়।" এটি তাদের তীব্র ভয় এবং আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার অনিচ্ছাকে চিত্রিত করে। তারা আল্লাহর কথা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়, যেন কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিলে বিপদ কেটে যাবে।

শেষ বাক্যে আল্লাহ তায়া'লা বলেন: `وَاللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَٰفِرِينَ` অর্থাৎ "আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।" এর অর্থ হলো, তাদের ভয় বা লুকানোর চেষ্টা বৃথা। আল্লাহ তাদের সব কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত, তার ক্ষমতা তাদের ঘিরে রেখেছে এবং তারা আল্লাহর বিচার থেকে পালাতে পারবে না। ইমাম তাবারী এবং ইমাম রাযী উল্লেখ করেন যে, এর অর্থ আল্লাহ তাদের সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং তিনি তাদের একত্রিত করে শাস্তি দেবেন।

এই আয়াতটি মদীনার মুনাফিকদের জন্য একটি বাস্তব চিত্র ছিল, যারা কখনও ইসলামের জয়ে আনন্দিত হত, আবার কখনও বিপদ দেখলে নিজেদের গুটিয়ে নিত। প্রকৃতির ভয়াবহতার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের অন্তরের এই অস্থিরতা ও ভীরুতাকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন।

সূত্র: al-Tabari (Jami al-Bayan), Ma'arif al-Quran (Mufti Shafi), al-Baghawi (Maalim al-Tanzil), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), Ibn Kathir

জাগতিক আয়না

হৃদয় দিয়ে আয়াতটি নিয়ে আমরা চিন্তা করব। এই আয়াতটি মুনাফিকদের একটি বিশেষ অবস্থা তুলে ধরে, যেন এটি আমাদের সামনে একটি আয়নার মতো তাদের মনোজগতকে প্রতিফলিত করে।

আয়াতের প্রেক্ষাপট

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একদল মুনাফিকের (`منافقين`) অবস্থা তুলে ধরেছেন। এরা এমন লোক, যারা মাঝে মাঝে সত্যকে দেখতে পায় আবার পরক্ষণেই তাতে সন্দেহ করে। আল্লাহ এখানে সরাসরি তাদের কথাই বলছেন। পরিস্থিতি হলো, আল্লাহ তাদের মানসিক অস্থিরতা, দ্বিধা এবং সত্যের প্রতি তাদের ভয়কে একটি শক্তিশালী উপমার মাধ্যমে বর্ণনা করছেন, যা তাদের পরিণামের প্রতি একটি সতর্কবাণী।

আয়াতের মূলভাব

আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, মুনাফিকদের অবস্থা এমন একদল লোকের মতো, যারা উন্মুক্ত প্রান্তরে হেঁটে চলেছে, আর হঠাৎ তাদের ওপর প্রবল বৃষ্টি (`صَيِّبٍ`) নেমে আসে। সেই বৃষ্টির সাথে থাকে ঘোর অন্ধকার (`ظُلُمَاتٌ`), বজ্রের গর্জন (`رَعْدٌ`) এবং বিদ্যুতের ঝলকানি (`بَرْقٌ`)। তারা মৃত্যুর ভয়ে বজ্রপাতের বিকট শব্দ থেকে বাঁচতে কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা কাফিরদেরকে (`الكافرين`) সবদিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন, তাদের পালানোর কোনো পথ নেই।

ইমাম ওয়াহবা আয-যুহাইলি (`al-Munir`) উল্লেখ করেছেন, কুরআন নিজেই যেন এই প্রবল বৃষ্টির মতো। এর মধ্যে রয়েছে কল্যাণ ও পথনির্দেশ। এর সতর্কবাণী ও ভীতি প্রদর্শন বজ্রের মতো। আর এর সুস্পষ্ট যুক্তি ও প্রমাণ বিদ্যুতের ঝলকের মতো, যা মুনাফিকদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। যখন জিহাদের মতো কঠিন আহ্বান আসে, তা যেন বজ্রপাতের মতোই ভীতিকর মনে হয়।

হৃদয়ের আলোড়ন ও বিশ্ববাস্তবতা

অন্তরের অবস্থা (নফস): সাইয়্যেদ কুতুব (`Sayyid Qutb`) যেমনটি বলেছেন, এই উপমাটি মুনাফিকদের `نفسیاتی صورتحال` (মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা) অর্থাৎ তাদের `اندرونی اضطراب، حیرت اور خوف و بے چینی` (আভ্যন্তরীণ উদ্বেগ, বিস্ময় ও অস্থিরতা) তুলে ধরে। যখনই সত্যের আলো ঝলক দিয়ে ওঠে, তারা সেই আলোতে কিছুক্ষণ চলে, কিন্তু যখন আবার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তারা থমকে দাঁড়ায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তাদের হৃদয় `قلق و اضطراب` (উদ্বেগ ও অস্থিরতায়) পূর্ণ। তারা যেন একই সময়ে আলো ও অন্ধকারের মধ্যে আটকে আছে, সত্যকে আকাঙ্ক্ষা করেও ভ্রষ্টতার বেড়াজালে বন্দী। তাযকিরুল কুরআন (`Tazkirul Quran`) আরও ব্যাখ্যা করেছেন, সত্যের আহ্বান যখন আসে, তা কেবল সুসংবাদই নিয়ে আসে না, কিছু `وقتی اندیشے` (সাময়িক আশঙ্কা) বা ভয়ও নিয়ে আসে, যেমন নিজেদের অহংকার ত্যাগ করা, জীবনের প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনা পরিবর্তন করা, প্রচলিত সমাজের সাথে সংঘাত। এসব ভয়েই তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

সামাজিক ও উম্মাহর বাস্তবতা: মুনাফিকদের এই চিত্র একটি `worldly mirror` বা জাগতিক আয়নার মতো আমাদের সমাজেও প্রতিভাত হতে পারে। ইবনে আল-জাওযি (`Ibn al-Jawzi`) উল্লেখ করেছেন, `وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكافِرِينَ` (আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন) মানে, তারা আল্লাহর হাত থেকে পালাতে পারবে না এবং কিয়ামতের দিনে তাদের একত্রিত করা হবে। ইসরার আহমদ (`Israr Ahmad`) এই বাক্যটির উপর জোর দিয়ে বলেছেন, অবিশ্বাসীরা আল্লাহর বেষ্টনী থেকে বাঁচতে পারবে না, তারা যাবে কোথায়? এটি শুধু পরকালীন জবাবদিহিতাই নয়, বরং দুনিয়াতেও আল্লাহর কর্তৃত্বের অবিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দেয়। মুনাফিকরা যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তাদের `hidden arrogance` (লুকানো অহংকার) বা `fear of loss` (হারানোর ভয়) তাদের সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। তারা পার্থিব লাভের জন্য দ্বিধা করে, কিন্তু এই সাময়িক সুযোগসন্ধান শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না, যেমনটি আল-মুনিয়ার (`al-Munir`) তাফসিরে বলা হয়েছে যে, মুনাফেকির মাধ্যমে সাময়িকভাবে কিছু লাভ হলেও তা স্থায়ী নয়, যেমন জ্বলে ওঠা আগুন নিভে যায়। তারা আলোর দিকে দৌড়ায় যখন সুবিধা দেখে, কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতে থেমে যায়। এটি সমাজে সত্যের মোকাবিলায় মানুষের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া এবং নড়বড়ে মানসিকতাকে তুলে ধরে।

সূত্র: Israr Ahmad (Bayan ul Quran), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), Tazkirul Quran, Ibn al-Jawzi (Zad al-Masir), al-Munir (Wahba al-Zuhayli)

সংযোগ

সুরা বাকারার ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের অবস্থার একটি অত্যন্ত জীবন্ত উপমা তুলে ধরেছেন। পূর্ববর্তী আয়াতে (২:১৭-১৮) তাদের আরেকটি অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল, আর এই আয়াতটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, যা মুনাফিকদের দোদুল্যমানতা এবং দ্বিধাপূর্ণ মানসিকতাকে গভীরভাবে তুলে ধরে। এখানে আল্লাহ মুনাফিকদের এমন এক দলের সাথে তুলনা করেছেন, যারা সত্য ও মিথ্যার মাঝে আটকে পড়ে দিকভ্রান্ত।

কোরআনের সাথে সম্পর্ক

এই আয়াতটি মুনাফিকদের অবস্থাকে এক ভয়ংকর বৃষ্টির সাথে তুলনা করছে। `أَوْ كَصَيِّبٍ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ` (`aw kaṣayyibim minas-samā'`) অর্থাৎ, "অথবা আকাশের প্রবল বর্ষণের ন্যায়"। `صيب` (`সাইয়্যিব`) মানে হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। যেমন বৃষ্টি মৃত ভূমিকে জীবন দান করে, তেমনি আল-কুরআনও মানব আত্মাকে জীবন ও হেদায়েত প্রদান করে। আল-বিক্বায়ী (Nazm al-Durar) এবং আশ-শিনক্বীতি (Adwa al-Bayan) এর ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে বৃষ্টিকে কোরআন এবং এর হেদায়েতের উপমা হিসেবে দেখা হয়েছে। বৃষ্টি যেমন আকাশ থেকে নেমে এসে মাটিকে সঞ্জীবিত করে, তেমনি উচ্চাসীন কোরআনও হৃদয়কে সজীব করে তোলে। এই উপমাটি সূরা আরাফ-এর ৫৮ নম্বর আয়াতের সাথেও সম্পর্কযুক্ত, যেখানে উত্তম ভূমি ও লবণাক্ত ভূমিতে বৃষ্টির ভিন্ন প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, যা সত্য গ্রহণে মানুষের ভিন্ন প্রকৃতির ইঙ্গিত দেয়। এই আয়াতে মুনাফিকদের বর্ণনা সেই সকল মানুষের শ্রেণীকরণকে সম্পূর্ণ করে, যারা ইমানদার নয়, আবার কাফিরও নয়, বরং মধ্যবর্তী এক দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে।

অন্ধকারের প্রতীক

এই ভয়াবহ বর্ষণের সাথে রয়েছে `ظُلُمَٰتٌۭ وَرَعْدٌۭ وَبَرْقٌۭ` (`ẓulumātunw wa ra'dunw wa barq`). অর্থাৎ "অন্ধকার, বজ্রধ্বনি ও বিদ্যুৎ চমক"। `ظلمات` (`জুলুমাত`) বা অন্ধকারগুলো মুনাফিকদের মনে কোরআন সম্পর্কে যে সন্দেহ ও সংশয় (`শুবুহাত`) রয়েছে, সেগুলোর প্রতীক। আশ-শিনক্বীতি উল্লেখ করেছেন যে, অনেক সময় কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত, যেমন কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশনা বা ইসরা ও মি'রাজের ঘটনা, দুর্বল ইমানদারদের জন্য এক প্রকার "অন্ধকার" বা সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। `رعد` (`রা'দ`) বা বজ্রধ্বনি হলো কোরআনের কঠোর সতর্কবাণী (`জাওয়াজির`) যা মুনাফিকদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করে এবং তাদের কপটতা প্রকাশ করে। যেমন বজ্রের শব্দে সবকিছু কেঁপে ওঠে, তেমনি কোরআনের ধমকি তাদের অন্তরকে কাঁপিয়ে দেয়। `برق` (`বারক`) বা বিদ্যুৎ হলো কোরআনের সুস্পষ্ট প্রমাণ (`আদিল্লা`) ও উজ্জ্বল নিদর্শন (`বারাহীন`), যা ক্ষণিকের জন্য তাদের কাছে সত্যের ঝলক দেখিয়ে দেয়। এই বিদ্যুৎ আলোকের মতো, যা কোরআনকে `নূর` (`নূর`) বা আলো হিসেবে বর্ণনা করে। কখনো কখনো এই ক্ষণস্থায়ী ঝলক তাদের অন্তরে সত্যের প্রতি এক মুহূর্তের জন্য হলেও আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

মৃত্যুর ভয় ও আল্লাহর বেষ্টনী

এই তীব্র বর্ষণ, অন্ধকার, বজ্র ও বিদ্যুৎ চমকের মধ্যে পড়ে মানুষ যেমন `يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِىٓ ءَاذَانِهِم مِّنَ ٱلصَّوَٰعِقِ حَذَرَ ٱلْمَوْتِ` (`yaj'alūna aṣābi'ahum fī ādhānihim minaṣ-ṣawā'iqi ḥadharal-mawti`) অর্থাৎ "বজ্রপাতের ভয়ে মৃত্যুর আশঙ্কায় কানে আঙুল প্রবেশ করায়," তেমনি মুনাফিকরা কোরআনের কড়া বার্তা ও সতর্কবাণী থেকে বাঁচতে চায়। তারা সত্যের বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন কানে আঙুল দিয়ে তারা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসা বিপদ ও মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারবে। তবে আয়াতের শেষাংশ তাদের এই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়: `وَٱللَّهُ مُحِيطٌۢ بِٱلْكَٰفِرِينَ` (`wallāhu muḥīṭum bil-kāfirīn`) অর্থাৎ "আল্লাহ কাফিরদেরকে বেষ্টন করে আছেন।" আশ-শিনক্বীতি (Adwa al-Bayan) ও আল-ওয়াসিত (Tantawi) এর ব্যাখ্যানুসারে, `মুহীত` (`muḥīṭ`) মানে হলো আল্লাহ তাদের সর্বদিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন, তাদের কোনো পালানোর পথ নেই। তিনি তাদেরকে ধ্বংসকারী বা পরাভূতকারী। এই বাক্যটি মুনাফিকদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা যে, তারা যত চেষ্টাই করুক না কেন, আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞান থেকে তারা কোনোভাবেই পালাতে পারবে না। তাদের কপটতা বা অবিশ্বাস আল্লাহর কাছে গোপন নেই, এবং তাদের পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

সূত্র: al-Wasit (Tantawi), al-Biqa'i (Nazm al-Durar), al-Shinqiti (Adwa al-Bayan), al-Sabuni (Safwat al-Tafasir)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৫টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন