সূরা মারইয়াম ১৯:৪৬

سُورَةُ مَرۡيَمَ · মাক্কী · আয়াত ৪৬/৯৮

قَالَ أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ ءَالِهَتِى يَٰٓإِبْرَٰهِيمُ ۖ لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ ۖ وَٱهْجُرْنِى مَلِيًّۭا

অনুবাদ

পিতা বললঃ যে ইব্রাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, আমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণনাশ করব। তুমি চিরতরে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) যখন তার পিতাকে কোমলভাবে তাওহীদের দিকে ডাকলেন, তখন পিতা তীব্র কঠোরতা ও অবিশ্বাসের সাথে প্রতিক্রিয়া জানালেন, যা এই আয়াতে তাঁর শব্দচয়নে স্পষ্ট।

পিতার জিজ্ঞাসা ও বিস্ময়

ইব্রাহিমের পিতা বললেন: ﴿أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ ءَالِهَتِى يَٰٓإِبْرَٰهِيمُ﴾ (`Araghibun Anta 'an alihatee ya Ibraheem?`) - "তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ, হে ইব্রাহিম?" এখানে `أراغب أنت` (তুমি কি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ?) প্রশ্নটি শুধুই জিজ্ঞাসা নয়, বরং ইব্রাহিমের এই কাজের প্রতি পিতার তীব্র অস্বীকৃতি ও বিস্ময় প্রকাশ করে। ইবন আশুর উল্লেখ করেছেন যে, এই শব্দ বিন্যাসে `রাগিব` (মুখ ফেরানো) শব্দটি `আঁতা` (তুমি) এর আগে এনে জোর দেওয়া হয়েছে, যা পিতার কাছে ইব্রাহিমের এই কর্মটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এবং আশ্চর্যজনক ছিল তা বোঝায়। পিতা নিজের উপাস্যদেরকে `آلهتي` (আমার উপাস্যরা) বলে সম্বোধন করছেন, যা থেকে তাদের প্রতি তার গভীর আনুগত্য ও অধিকারবোধ বোঝা যায়। এছাড়াও, ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) যখন পিতাকে ﴿يا أَبَتِ﴾ (হে আমার পিতা!) বলে ডেকেছিলেন, তখন পিতা পাল্টা ﴿يا إِبْرَاهِيمُ﴾ (হে ইব্রাহিম!) বলে ডাকলেন, `يا بني` (হে আমার পুত্র!) বলেননি। আল-যামাখশারি ও আল-রাযি এই পার্থক্যকে পিতার রুক্ষতা ও সম্পর্কচ্ছেদের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন।

কঠোর হুমকি

এরপর পিতা হুমকি দিলেন: ﴿لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ﴾ (`La-in lam tantahi la-arjumannaka`) - "যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব।" এখানে `لَئِن` শব্দটি একটি শপথসূচক 'লাম' দ্বারা জোরদার করা হয়েছে, যা পিতার হুমকির সত্যতাকে নিশ্চিত করে। `لأَرْجُمَنَّكَ` (আমি তোমাকে পাথর মারবো) শব্দটি `রজম` (`rajm`) ধাতু থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ পাথর নিক্ষেপ। ইবন আশুর ও আল-রাযি উভয়ই এর অর্থ 'পাথর মেরে হত্যা করা' হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা তৎকালীন সমাজে একটি পরিচিত শাস্তি ছিল। তবে, আল-যামাখশারি ও আল-রাযি এও উল্লেখ করেছেন যে, এর অর্থ মৌখিক গালি বা নিন্দা করাও হতে পারে, যদিও পাথর মেরে হত্যা করার অর্থটিই বেশি প্রচলিত।

চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতার নির্দেশ

সবশেষে পিতা বললেন: ﴿وَٱهْجُرْنِى مَلِيًّۭا﴾ (`Wahjurnee maliyya`) - "এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাও।" এখানে পিতা নিজেই ইব্রাহিমকে ছেড়ে চলে যেতে বলছেন, যা শুধু সম্পর্কের অবসান নয়, বরং ইবন আশুরের মতে, এটি ইব্রাহিমকে অপমান করা এবং তাকে সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে 'তাড়িয়ে দেওয়ার' ইঙ্গিত দেয়। `مليًّا` (`maliyya`) শব্দের অর্থ 'দীর্ঘ সময় ধরে'। এটি নির্দেশ করে যে এই বিচ্ছিন্নতা ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর বিচ্ছেদ। পিতার পক্ষ থেকে এই বাক্যটি ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এর প্রতি তার চরম প্রত্যাখ্যান এবং তার আহ্বানের প্রতি তীব্র অনীহা প্রকাশ করে।

এই আয়াতটিতে শব্দচয়ন, বাক্য গঠন এবং সম্বোধনের মধ্য দিয়ে ইব্রাহিমের পিতার কঠোরতা, অটল কুফরি এবং পুত্রের প্রতি স্নেহহীন আচরণের একটি পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে।

Source: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১৪টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন