সূরা আল-কাফিরুন ১০৯:১

سُورَةُ الكَافِرُونَ · মাক্কী · আয়াত ১/৬

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ قُلْ يَٰٓأَيُّهَا ٱلْكَٰفِرُونَ

অনুবাদ

বলুন, হে কাফেরকূল,

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

সূরা কাফিরুনের এই প্রথম আয়াতটি, `قُلْ يَٰٓأَيُّهَا ٱلْكَٰفِرُونَ` (বলো, হে কাফিরগণ), আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এমন একটি শক্তিশালী বার্তা, যা আমাদের গভীর মনোযোগ ও হৃদয়ের বিনয় নিয়ে শুনতে হবে। এটি কেবল কিছু অক্ষর বা শব্দ নয়, বরং তাঁর অটল ইচ্ছা এবং তাওহীদের (আল্লাহর একত্ববাদ) অপরিহার্যতার ঘোষণা। এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ কীভাবে এই গভীর বার্তা প্রকাশ করে, তা আমরা একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করি।

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট

এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় যখন কুরাইশের কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যাদের মধ্যে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাহ এবং আস ইবনে ওয়াইল অন্যতম, নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে একটি আপোষের প্রস্তাব দিয়েছিল। তারা চেয়েছিল, এক বছর নবী তাদের দেবতাদের উপাসনা করবেন এবং পরের বছর তারা নবীর আল্লাহর উপাসনা করবে। এটি ছিল তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদ) এবং শিরকের (আল্লাহর সাথে শরীক করা) মধ্যে একটি আপোষের চেষ্টা। আল-মুয়াসসার তাফসীর অনুযায়ী, এই আয়াতটি তাদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে এই আপোষ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে এবং তাদের সামনে সত্য স্পষ্ট করে দিতে আদেশ করলেন।

'বলো' শব্দের তাৎপর্য

আয়াতটি শুরু হয়েছে `قُلْ` (`qul`, 'বলো') আদেশসূচক ক্রিয়াটি দিয়ে। ইবনে আশুর এবং আল-রাযী দুজনেই এই শব্দের বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি সাধারণ বলার নির্দেশ নয়, বরং এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, এই কথাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

আল-রাযী উল্লেখ করেছেন, সাধারণত নবীজী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও নম্র স্বভাবের। তাই এমন কঠোর শব্দ ব্যবহার করতে সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক আদেশ আসার প্রয়োজন ছিল, যাতে তা তাঁর ব্যক্তিগত মত না হয়ে আল্লাহর বাণী হিসেবে গণ্য হয়। এটি নবীজীর দায়িত্বের গুরুত্বকেও বোঝায়; তাকে আল্লাহর সকল নির্দেশ, এমনকি কঠিনগুলিও, নির্ভয়ে প্রচার করতে হবে। এই `قُلْ` শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহ আপোষের প্রস্তাবের মুখে নবীজীর প্রাথমিক নীরবতার যেকোনো ভুল ব্যাখ্যা দূর করে দেন। নবীজীর নীরবতা দুর্বলতা বা দ্বিধা নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা ছিল, এবং `قُلْ` এর মাধ্যমে এখন তাঁর অবস্থান স্পষ্ট ও আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ করা হলো।

'হে কাফিরগণ' এর স্পষ্টতা

এরপরের অংশ, `يَٰٓأَيُّهَا ٱلْكَٰفِرُونَ` (`ya ayyuhal-kafirun`, 'হে কাফিরগণ'), এর সরাসরি সম্বোধনও বিশেষ অর্থবহ। আল-রাযী `يا أيها` (`Ya Ayyuha`) এর ব্যবহার ব্যাখ্যা করে বলেন, `يا` (দূরত্বের জন্য), `أي` (নিকটত্বের জন্য), এবং `ها` (সতর্কতার জন্য) এর সংমিশ্রণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের কুফরীর কারণে তারা আল্লাহ থেকে অনেক দূরে, কিন্তু আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ তাদের কাছেও পৌঁছে যায়।

ইবনে আশুর এই সম্বোধনকে কুরাইশদের প্রতি `تحقيرًا لهم` (তাদের তুচ্ছজ্ঞান করার) এবং `تبرؤا منهم` (তাদের থেকে বিচ্ছেদ ঘোষণা করার) একটি উপায় হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, নবীজী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে কারো ভয়ে ভীত নন, সত্য প্রকাশে তিনি অটল। আল-রাযী আরও যোগ করেন যে, `الكافر` (`kafir`) শব্দটি `جاهেল` (অজ্ঞ) এর চেয়ে অনেক বেশি তীব্র নিন্দা সূচক, যা এই আপোষের প্রস্তাবের মারাত্মক প্রকৃতি তুলে ধরে। এই সুনির্দিষ্ট এবং অটল ঘোষণা নবীজীর চিরন্তন দয়ার বিপরীতে হলেও, তাওহীদের ক্ষেত্রে কোনো আপোষের স্থান নেই, এই মৌলিক সত্যটিই এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন