সূরা আন-নিসা ৪:১২৯
سُورَةُ النِّسَاءِ · মাদানী · আয়াত ১২৯/১৭৬
وَلَن تَسْتَطِيعُوٓا۟ أَن تَعْدِلُوا۟ بَيْنَ ٱلنِّسَآءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا۟ كُلَّ ٱلْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَٱلْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا۟ وَتَتَّقُوا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا
অনুবাদ
তোমরা কখনও নারীদেরকে সমান রাখতে পারবে না, যদিও এর আকাঙ্ক্ষী হও। অতএব, সম্পূর্ণ ঝুঁকেও পড়ো না যে, একজনকে ফেলে রাখ দোদুল্যমান অবস্থায়। যদি সংশোধন কর এবং খোদাভীরু হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
কুরআনিক জগত
সুরা আন-নিসার ১২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এমন পুরুষদের সম্বোধন করছেন যাদের একাধিক স্ত্রী আছে। এই আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের হৃদয় আল্লাহ তা'আলার হাতে। আমরা যখন এই আয়াতের গভীরতা উপলব্ধি করি, তখন এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ের প্রেক্ষাপট থেকে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে এক বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে।
আয়াতের প্রেক্ষাপট
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সরাসরি বিশ্বাসী পুরুষদের সম্বোধন করছেন যারা একাধিক বিবাহের সাথে যুক্ত। আয়াতে বলা হয়েছে, "তোমরা নারীদের মধ্যে সর্বতোভাবে সুবিচার করতে কখনো সক্ষম হবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো।" এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা স্পষ্ট করে দেন যে, হৃদয়ের ভালোবাসা এবং সহজাত আকর্ষণ সম্পূর্ণভাবে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ভালোবাসার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সমতা আনা মানুষের পক্ষে অসম্ভব, এমনকি যদি সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। তবে আল্লাহ এরপরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন: "সুতরাং তোমরা (একজনের দিকে) সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ো না, যাতে অন্যকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছেড়ে দাও।" অর্থাৎ, হৃদয়ের আকর্ষণে তার প্রকাশ এমনভাবে যেন না হয় যে, এক স্ত্রীকে অন্য স্ত্রীর সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে এমন অবস্থায় রেখে দেওয়া হয় যেন সে বিবাহিতাও নয় আবার তালাকপ্রাপ্তাও নয়। শেষে আল্লাহ আশ্বাস দিচ্ছেন: "যদি তোমরা নিজেদের আচরণ সংশোধন করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
অন্তরের ভালোবাসা ও বাইরের আচরণ
আয়াতটি মানুষের এক গভীর দুর্বলতাকে তুলে ধরেছে: হৃদয়ের ভালোবাসায় পূর্ণ সমতা অর্জন করা অসম্ভব। ইমাম আল-রাযী এবং অন্যান্য তাফসীরকারগণ উল্লেখ করেছেন যে, এটা স্বভাবের ঝোঁক, আর এর উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি প্রসিদ্ধ দু'আ আমাদের জন্য পথনির্দেশক: "اللهم هذا قسمي فيما أملك فلا تلمني فيما تملك ولا أملك" (`Allahumma hadha qasmi fima amliku fala talumni fima tamliku wala amliku`), অর্থাৎ "হে আল্লাহ, এই আমার বন্টন, যা আমার ক্ষমতার অধীন। যা তোমার ক্ষমতার অধীন, আমার ক্ষমতার অধীন নয়, সে বিষয়ে আমাকে তিরস্কার করো না।" (আল-বাগাওয়ী, আল-রাযী)। এখানে "যা আমার ক্ষমতার অধীন নয়" বলতে হৃদয়ের ভালোবাসা ও আকর্ষণকে বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু হৃদয়ের এই অক্ষমতা বাহ্যিক আচরণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণ হতে পারে না। এই নির্দেশনার প্রেক্ষাপটেই আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যার দুটি স্ত্রী আছে আর সে তাদের একজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে যায়, কিয়ামতের দিন তার এক দিক ঝুলে পড়া অবস্থায় আসবে।" (ইবনে কাছীর)। এটি আমাদের দেখায় যে, যদিও হৃদয়ের ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, তবে রাত কাটানো, ভরণপোষণ, হাসিমুখ ও কথাবার্তায় সমতা বজায় রাখা মানুষের ইচ্ছাধীন এবং এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
'ঝুলন্ত' নারী
আল্লাহ তা'আলা পুরুষদের সতর্ক করে বলেছেন যেন তারা একজন স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ে অন্যকে "كالمعلقة" (`kal-mu'allaqah`) বা 'ঝুলন্ত' অবস্থায় না ফেলে দেয়। ইমাম আত-তাবারি, ইবনে কাছীর এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ এর অর্থ করেছেন এমন নারী, যে না সম্পূর্ণ বিবাহিত, না সম্পূর্ণ তালাকপ্রাপ্ত। অর্থাৎ, তাকে বিবাহ বন্ধনে আটকে রাখা হয়েছে, কিন্তু স্বামী তার সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখে না, তার প্রতি অবহেলা করে, ফলে সে তালাকও চাইতে পারে না আবার স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকারও পায় না। এটি একটি চরম অবিচার, যা নারীকে এক নিদারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। এই অবস্থার সৃষ্টি করা ইসলামী শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
ক্ষমা ও তাকওয়া
আয়াতের শেষ অংশটি আশার আলো নিয়ে আসে। যদি পুরুষেরা তাদের আচরণে সংশোধন আনে এবং আল্লাহকে ভয় করে, অর্থাৎ অন্যায় থেকে বিরত থাকে ও স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকে, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল-রাযী এবং আত-তাবারি ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে 'সংশোধন' বলতে অতীত ভুলের জন্য তওবা করা এবং ভবিষ্যতে ন্যায়পরায়ণ হওয়ার ইচ্ছাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ মানুষের হৃদয়ের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত আছেন, তাই তিনি এমন ক্ষমা ও দয়ার দ্বার উন্মুক্ত রেখেছেন যারা তাদের সাধ্যমতো ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এই আয়াতটি দম্পত্য জীবনে মানুষের সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর অসীম রহমতের এক অপূর্ব সমন্বয়। এটি আমাদেরকে একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখায়, যেখানে মানবিক দুর্বলতা সত্ত্বেও ন্যায় ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।
সূত্র: al-Baghawi (Maalim al-Tanzil), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), al-Tabari (Jami al-Bayan), Ibn Kathir, Ma'arif al-Quran (Mufti Shafi)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।