সূরা আল-বাকারা ২:১৩
سُورَةُ البَقَرَةِ · মাদানী · আয়াত ১৩/২৮৬
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ ءَامِنُوا۟ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ قَالُوٓا۟ أَنُؤْمِنُ كَمَآ ءَامَنَ ٱلسُّفَهَآءُ ۗ أَلَآ إِنَّهُمْ هُمُ ٱلسُّفَهَآءُ وَلَٰكِن لَّا يَعْلَمُونَ
অনুবাদ
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, অন্যান্যরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আন, তখন তারা বলে, আমরাও কি ঈমান আনব বোকাদেরই মত! মনে রেখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বোকা, কিন্তু তারা তা বোঝে না।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের মানসিকতা ও তাদের প্রতি তাঁর জবাব তুলে ধরেছেন। আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে, আমরা বিনয় ও সম্মানের সাথে আয়াতটি নিয়ে ভাবব, নিজেদের এর মাধ্যমে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ দেব।
এই আয়াতের মূল কথা
এই আয়াতে মুনাফিকদের (প্রকাশ্যে মুসলিম কিন্তু গোপনে কাফির) কথা বলা হয়েছে। যখন তাদেরকে বলা হয়, "তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করো, যেভাবে অন্য সাধারণ মানুষরা বিশ্বাস করেছে" (`آمنوا كما آمن الناس`), তখন তারা তাচ্ছিল্য ভরে উত্তর দেয়, "আমরা কি তাদের মতো বিশ্বাস করব, যারা নির্বোধ?" (`أنؤمن كما آمن السفهاء`)। এর উত্তরে আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে ঘোষণা করেন, "সাবধান! নিশ্চয়ই তারাই প্রকৃত নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না" (`ألا إنهم هم السفهاء ولكن لا يعلمون`)।
শব্দের গভীরতা
আয়াতে `قيل لهم` অর্থাৎ "তাদেরকে বলা হয়" শব্দটি প্যাসিভ ভয়েসে (কর্মবাচ্য) এসেছে। ইবন আশুর (Ibn Ashur) বলেছেন, এর বক্তা নির্দিষ্ট নয়। এই পরামর্শ হয়তো মুনাফিকদের পরিচিত মুসলিমরাই দিয়েছিলেন, অথবা তাদেরই ভেতরের কেউ কেউ নিফাক ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিল। `الناس` (`an-naas`) শব্দটি এখানে সকল সাধারণ মানুষকে বোঝাচ্ছে না, বরং খাঁটি মুমিনদের, বিশেষত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের (Companions) ইঙ্গিত করছে, যারা আন্তরিকভাবে ঈমান এনেছিলেন। `كما` (`kamaa`) শব্দটি তুলনা বোঝায়, অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস শুধু মুখে নয়, বরং অন্তর ও কর্মেও খাঁটি হওয়া উচিত।
মুনাফিকরা মুমিনদের `السفهاء` (`as-sufahaa`, নির্বোধ বা মূর্খ) বলে তাচ্ছিল্য করেছে। আল-রাযী (al-Razi) এবং ইবন আশুর বর্ণনা করেন যে `সফাহাহ` (`safaaha`) অর্থ হলো বুদ্ধির দুর্বলতা, সঠিক বিচারবোধের অভাব বা অবিবেচক হওয়া। মুনাফিকরা নিজেদেরকে চতুর এবং বিচক্ষণ মনে করত, আর সরল বিশ্বাসী মুমিনদেরকে দুনিয়াবী বিষয়ে অজ্ঞ ভেবে নির্বোধ আখ্যা দিত। তাদের প্রশ্ন `أنؤمن` (`anun'min`, আমরা কি বিশ্বাস করব?) আসলে অস্বীকার এবং অবজ্ঞা প্রকাশ করে।
আল্লাহর প্রত্যুত্তর
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, `ألا إنهم هم السفهاء` অর্থাৎ "সাবধান! নিশ্চয়ই তারাই প্রকৃত নির্বোধ।" এখানে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়:
১. `ألا` (`alaa`): এটি একটি শক্তিশালী সতর্কবাণী এবং মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এটি এমন একটি ঘোষণা যা শ্রোতাকে সচেতন করে।
২. `إنهم` (`innahum`): `إن` (`inna`) শব্দটি জোর এবং নিশ্চয়তা প্রদান করে।
৩. `هم` (`hum`): এটি একটি বিশেষ সর্বনাম যা "ফাসল" (`fasl`) নামে পরিচিত। ইবন আশুর এটি `কসর` (`qasr`, একচেটিয়া) বোঝাতে ব্যবহার করেছেন, যা নিশ্চিত করে যে নির্বুদ্ধিতা কেবল মুনাফিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, মুমিনদের মধ্যে নয়।
জানার সাথে না জানার পার্থক্য
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, `ولكن لا يعلمون` (`walaakin la ya'lamoon`, কিন্তু তারা তা জানে না)। এটি পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত `لا يشعرون` (`la yash'uroon`, তারা উপলব্ধি করে না) থেকে ভিন্ন। আল-রাযী ও আল-জাদওয়াল (al-Jadwal) এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছেন:
- `লা ইয়াশ’উরুন` (`la yash'uroon`) দ্বারা বোঝানো হয় কোনো কিছুর প্রাথমিক উপলব্ধি বা সংবেদনশীলতার অভাব, যেমন তারা তাদের ফিতনা-ফ্যাসাদের পার্থিব পরিণতি উপলব্ধি করে না।
- `লা ইয়া’লামুন` (`la ya'lamoon`) দ্বারা বোঝানো হয় গভীর জ্ঞানের অভাব, যা প্রমাণ ও যুক্তির উপর নির্ভরশীল। মুনাফিকরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বা কারা প্রকৃত অর্থে নির্বোধ, তা বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। তাদের নির্বুদ্ধিতা কোনো সাধারণ অনুভূতি বা অনুধাবনহীনতা নয়, বরং এটি এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব। `সফাহাহ` (`safaaha`) বা নির্বুদ্ধিতা নিজেই এক প্রকার `জাহল` (`jahl`) বা অজ্ঞতা, তাই `লা ইয়া’লামুন` (তারা জানে না) শব্দটি এর সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা দুনিয়াবী চালাকি বা ক্ষমতার মধ্যে নিহিত নয়, বরং তা আল্লাহ তাআলার প্রতি আন্তরিক ঈমান এবং তার নির্দেশনার মধ্যে থাকে। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে এবং মুমিনদের তুচ্ছ করে, তারাই প্রকৃত অর্থে নির্বোধ, যদিও তারা তা বুঝতে পারে না।
সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Jalalayn
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ১১টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।