সূরা মারইয়াম ১৯:৪৪
سُورَةُ مَرۡيَمَ · মাক্কী · আয়াত ৪৪/৯৮
يَٰٓأَبَتِ لَا تَعْبُدِ ٱلشَّيْطَٰنَ ۖ إِنَّ ٱلشَّيْطَٰنَ كَانَ لِلرَّحْمَٰنِ عَصِيًّۭا
অনুবাদ
হে আমার পিতা, শয়তানের এবাদত করো না। নিশ্চয় শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
সুরা মারইয়ামের ৪৪ নং আয়াতে, যখন আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর পিতার কথোপকথন তুলে ধরছেন, তখন তিনি তার পিতাকে বলছেন: "হে আমার আব্বা, শয়তানের উপাসনা করবেন না, কারণ শয়তান তো দয়াময় আল্লাহর প্রতি অবাধ্য।"
স্নেহের ডাক: `يا أَبَتِ`
এই আয়াতে এবং এর আগের ও পরের আয়াতগুলোতে ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) বারবার তাঁর পিতাকে `يا أَبَتِ` (ইয়া আবাতী) বলে সম্বোধন করেছেন। ইবনে আশুর এবং জামাখশারি উল্লেখ করেছেন যে, এই পুনরাবৃত্তি গভীর স্নেহ, সহানুভূতি এবং আকুতি প্রকাশ করে। `أَبَتِ` শব্দের শেষে যে `تاء` (তা) আছে, তা আসলে মালিকানার `ياء` (য়া) এর স্থলাভিষিক্ত, যা "আমার পিতা" অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে সম্বোধনে আরও অন্তরঙ্গতা ও সম্মান প্রকাশ পায়, যেন বলছেন, "আমার প্রিয় বাবা"। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এই আদবের মাধ্যমে তাঁর পিতাকে নরমভাবে সত্যের দিকে ডাকছেন।
শয়তানকে উপাসনা না করার নির্দেশ
এরপর ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) বলেন, `لَا تَعْبُدِ ٱلشَّيْطَٰنَ` (লা তা'বুদিশ-শাইতানা), অর্থাৎ "শয়তানের উপাসনা করবেন না।" ইবনে আশুর, আল-জালালাইন এবং আল-রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে "শয়তানের উপাসনা" আসলে প্রতিমা পূজার একটি রূপক। যদিও ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর পিতা সরাসরি শয়তানের উপাসনা করতেন না, কিন্তু প্রতিমা পূজার মাধ্যমে তারা শয়তানের কুমন্ত্রণার অনুসরণ করতেন। শয়তানের কুমন্ত্রণায় বিভ্রান্ত হয়েই মানুষ প্রতিমা তৈরি করে এবং সেগুলোর পূজা করে। ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) এর মাধ্যমে প্রতিমা পূজার আসল চেহারা উন্মোচন করেছেন: এটি আসলে শয়তানের আনুগত্য, যা মানুষের সহজাত ঘৃণার বিষয়। এই শব্দচয়ন প্রতিমা পূজার মন্দ দিকটিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে এবং মানুষকে তা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে।
অবাধ্য শয়তানের পরিচয়
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, `إِنَّ ٱلشَّيْطَٰنَ كَانَ لِلرَّحْمَٰنِ عَصِيًّۭا` (ইন্নাশ-শাইতানা কানা লির-রাহমানি 'আসিয়্যা), অর্থাৎ "কারণ শয়তান তো দয়াময় আল্লাহর প্রতি অবাধ্য।" এখানে `عَصِيًّا` (`'আসিয়্যা`) শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। ইবনে আশুর এর অর্থ 'অত্যন্ত অবাধ্য' (`صيغ المبالغة` - সিগাহ আল-মুবালাগাহ) হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা শয়তানের গভীর এবং ধারাবাহিক অবাধ্যতা নির্দেশ করে। আল-জালালাইনও একে 'প্রচুর অবাধ্য' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এছাড়াও, `كَانَ` (`কানা` - ছিল) ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, শয়তানের এই অবাধ্যতা তার একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য, যা তার প্রকৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, `لِلرَّحْمَٰنِ` (লির-রাহমান) – "দয়াময় আল্লাহর প্রতি" - এই বিশেষণটির ব্যবহার। ইবনে আশুর এবং আল-রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, `الرَّحْمَٰنِ` (আর-রাহমান, পরম দয়ালু) নামটি নির্বাচন করা হয়েছে এক তীক্ষ্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরার জন্য। শয়তান পরম দয়ালু আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত পাওয়ার পরও তার প্রতি চরমভাবে অবাধ্য। এটি শয়তানের অকৃতজ্ঞতা এবং ঔদ্ধত্যকে তুলে ধরে। যে সত্তা পরম দয়াময় আল্লাহর প্রতি এতটা অবাধ্য, সে মানুষকে কখনই কল্যাণকর কোনো কিছুর নির্দেশ দিতে পারে না, বরং সে কেবল আল্লাহর ক্রোধ ও করুণা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পথেই ডাকে। তাই, শয়তানের অনুসরণ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে।
সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।