সূরা মারইয়াম ১৯:৪২

سُورَةُ مَرۡيَمَ · মাক্কী · আয়াত ৪২/৯৮

إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ يَٰٓأَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِى عَنكَ شَيْـًۭٔا

অনুবাদ

যখন তিনি তার পিতাকে বললেনঃ হে আমার পিতা, যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না, তার এবাদত কেন কর?

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

সুরা মারইয়ামের ৪২ নম্বর আয়াতে আমরা নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর কথা তার পিতা আযরের প্রতি শুনি। এই আয়াতে ইব্রাহিম (আ.) যেভাবে তার পিতাকে সম্বোধন করেছেন, তা গভীর ভাবনা ও বিনয়ের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। আয়াতের প্রতিটি শব্দই আল্লাহর কালামের মাধুর্য ও শিক্ষণীয় দিক তুলে ধরে।

প্রথম সম্ভাষণ: "ইয়া আবাতী" (`Ya Abati`)

আয়াতে ইব্রাহিম (আ.) তার পিতাকে "ইয়া আবাতী" (يا أبتِ) বলে সম্বোধন করেছেন। আরবিতে এই শব্দটি 'হে আমার পিতা' অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি ডাক নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা, স্নেহ এবং বিনয়ের প্রকাশ। তাফসীরবিদ আল-যামাখশারী এবং আল-রাযী উল্লেখ করেছেন যে, এই সম্বোধনে `tawassul` (আল্লাহর কাছে নৈকট্য চাওয়া) এবং `ista'taf` (স্নেহ বা দয়া প্রার্থনা) এর অনুভূতি রয়েছে। ইবন আশুর বলেছেন, এটি বারবার (পরবর্তী আয়াতগুলোতেও) ব্যবহার করা হয়েছে যেন পিতা মনোযোগ সহকারে তার কথা শোনেন এবং উপদেশ গ্রহণ করেন। এখানে `তা` (ت) অক্ষরটি আসলে `ইয়া` (ي) এর পরিবর্তে এসেছে, যা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বোঝায়। এর মাধ্যমে ইব্রাহিম (আ.) তার পিতাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও কোমলতার সাথে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

মূল প্রশ্ন: "কেন পূজা করো?" (`Lima Ta'budu?`)

এরপর ইব্রাহিম (আ.) যে প্রশ্নটি করেছেন, তা হলো "লিমাত তা'বুদু" (لِمَ تَعْبُدُ) – "আপনি কেন পূজা করেন?" এই প্রশ্নটি সরাসরি অভিযোগমূলক নয়, বরং এটি পিতাকে চিন্তা করার জন্য একটি উন্মুক্ত আমন্ত্রণ। আল-যামাখশারী ব্যাখ্যা করেন যে, ইব্রাহিম (আ.) তার পিতাকে তার ভুলের কারণ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করছেন, যেন পিতা নিজেই তার কাজের অযৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে পারেন। ইবন আশুর একে `istifham` (প্রশ্ন) এর একটি ধরণ বলেছেন, যা বাহ্যত প্রশ্ন হলেও এর আড়ালে এমন একটি `kinayah` (ইঙ্গিত) রয়েছে যে, এই পূজার পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।

উপাস্যের অযোগ্যতা

আয়াতে উল্লেখিত মূর্তির তিনটি অক্ষমতা ইব্রাহিম (আ.) তুলে ধরেছেন:
১. "লা ইয়াসমা'উ" (لا يَسْمَعُ): "যা শুনতে পায় না।"
২. "ওয়ালা ইয়ুবসিরু" (وَلَا يُبْصِرُ): "এবং দেখতে পায় না।"
৩. "ওয়ালা ইয়ুগনি আনকা শাইয়ান" (وَلَا يُغْنِي عَنكَ شَيْـًۭٔا): "এবং তোমার কোনো উপকারে আসে না।"

আল-রাযী এবং আল-যামাখশারী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই গুণগুলো উপাস্য হওয়ার জন্য অপরিহার্য। যে সত্তা শুনতে পায় না, সে তার উপাসকের দোয়া বা প্রার্থনা শুনবে কীভাবে? যে দেখতে পায় না, সে উপাসকের বিনয় বা ভক্তি দেখবে কীভাবে? আর যে সত্তা কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না, তার উপাসনা করে কী লাভ? ইবন আশুর বলেন, এই যুক্তিগুলো `হিস` (অনুভূতি) দ্বারা সহজেই বোঝা যায়। ইব্রাহিম (আ.) তার পিতাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, তুমি এমন কিছুর উপাসনা করছো যা পাথরের মতো নিষ্ক্রিয়, যা নিজেরই যত্ন নিতে অক্ষম, অন্যের উপকার তো দূরের কথা।

এই আয়াতের শব্দচয়ন আমাদের শেখায় যে, এমনকি যখন আমরা সবচেয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হই, তখনও সর্বোচ্চ বিনয়, কোমলতা এবং যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করা উচিত। ইব্রাহিম (আ.) এর এই কথোপকথন দা'ওয়াত (আল্লাহর পথে আহ্বান) এর এক আদর্শ পদ্ধতি।

সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jalalayn, al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৯টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন