সূরা মারইয়াম ১৯:৪১

سُورَةُ مَرۡيَمَ · মাক্কী · আয়াত ৪১/৯৮

وَٱذْكُرْ فِى ٱلْكِتَٰبِ إِبْرَٰهِيمَ ۚ إِنَّهُۥ كَانَ صِدِّيقًۭا نَّبِيًّا

অনুবাদ

আপনি এই কিতাবে ইব্রাহীমের কথা বর্ণনা করুন। নিশ্চয় তিনি ছিলেন সত্যবাদী, নবী।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

আল্লাহর নির্দেশ ও ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর পরিচয়

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় রাসূল (ﷺ) কে নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তিনি কিতাবে, অর্থাৎ আল-কুরআনে, ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর কথা তুলে ধরেন। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং এটি একটি ঐশ্বরিক নির্দেশনা যে, ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর জীবন ও আদর্শ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই নির্দেশের পরপরই আল্লাহ ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর দুটি মূল গুণ বর্ণনা করেছেন: `إِنَّهُۥ كَانَ صِدِّيقًۭا نَّبِيًّا` (নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন পরম সত্যবাদী, নবী)। এই শব্দচয়নগুলো ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকে গভীরভাবে তুলে ধরে।

পরম সত্যবাদী (`صِدِّيقًۭا`) এর তাৎপর্য

আয়াতে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) কে `صِدِّيقًۭا` (`Siddīqan`) বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। `صِدِّيقًۭا` (`Siddīqan`) শব্দটি আরবির একটি বিশেষ রূপ, যা চরম বা পরম সত্যবাদিতাকে বোঝায়; এর অর্থ শুধু মুখে সত্য বলা নয়, বরং অন্তর থেকে, বিশ্বাসে ও কাজে সত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা। ইবন আশুর (Ibn Ashur) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর দ্বারা বোঝা যায় ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর দেওয়া সব দায়িত্ব পালনে চরম নিষ্ঠাবান ছিলেন। এমনকি যখন তাকে স্বপ্নে পুত্র কোরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তখনো তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি, যা তাঁর এই `Siddiq` (সিদ্দীক) গুণেরই মূর্ত প্রতীক।

নবী (`نَبِيًّا`) এর উচ্চ মর্যাদা

এরপরেই ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) কে `نَّبِيًّا` (`Nabiyyā`) বা নবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-রাযী (al-Razi) বলেছেন যে, `নবী` মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে জানানো সংবাদ বহনকারী, যিনি আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। এই উপাধিটি আল্লাহর কাছে তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও বিশেষ অবস্থানের প্রমাণ। লক্ষণীয় যে, এখানে `صِدِّيقًۭا` (সিদ্দীক) গুণটি `نَّبِيًّا` (নবী) গুণের আগে উল্লেখ করা হয়েছে। আল-রাযী ব্যাখ্যা করেন যে, প্রতিটি নবীকে অবশ্যই `Siddiq` (সিদ্দীক) হতে হয়। এটি `Siddiq` (সিদ্দীক) এর মর্যাদাকে আরও বৃদ্ধি করে এবং এটি যে নবুওয়াতের জন্য একটি অপরিহার্য ভিত্তি, তা বোঝায়।

শব্দের গাঁথুনি থেকে গভীর শিক্ষা

`إِنَّهُۥ كَانَ` (`Innahu Kāna` - নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন) এই দুটি শব্দ দিয়ে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর গুণাবলীকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। `إِنَّ` (`inna`) শব্দটি এখানে নিশ্চয়তা ও গুরুত্ব বোঝায়, আর `كَانَ` (`kāna`) তার গুণাবলীর স্থায়ী ও অবিচল প্রকৃতিকে নির্দেশ করে। ইবন আশুর (Ibn Ashur) বলেছেন, এই বাক্যটি তার প্রতি প্রশংসা ও সম্মান বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এই দুটি গুণের (পরম সত্যবাদিতা ও নবুওয়াত) বর্ণনা আয়াতে তার বাবার সঙ্গে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর পরবর্তী সংলাপে গভীর প্রভাব ফেলে। এটি বোঝায় যে, তার প্রতিটি কথা ছিল চরম সত্য ও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত, যা তার আহ্বানের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আল্লাহ এইভাবে সুনির্দিষ্ট শব্দচয়নের মাধ্যমে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) এর ব্যক্তিত্বকে আমাদের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন তার পুরো জীবনই আমাদের জন্য এক অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে থাকে।

সূত্র: al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১২টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন