সূরা আল-মুরসালাত ৭৭:১৫

سُورَةُ المُرۡسَلَاتِ · মাক্কী · আয়াত ১৫/৫০

وَيْلٌۭ يَوْمَئِذٍۢ لِّلْمُكَذِّبِينَ

অনুবাদ

সেদিন মিথ্যারোপকারীদের দুর্ভোগ হবে।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

হে পাঠক, এই আয়াতটি আপনার হৃদয়কে ছুঁয়ে যাক আল্লাহর অসীম ক্ষমতার মহিমা আর তাঁর সতর্কবার্তার গভীরতা দিয়ে। আসুন, আমরা এই মহিমান্বিত আয়াতের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকা অর্থ গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

৭৭ নম্বর সূরা মুরসালাতের ১৫ নম্বর আয়াতটি আমাদের সামনে একটি কঠোর বার্তা তুলে ধরে: "وَيْلٌۭ يَوْمَئِذٍۢ لِّلْمُكَذِّبِينَ" (`Waylun yawma'idhin lil-mukadhdhibeen`). অর্থাৎ, "সেই দিন অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ।" এই আয়াতটি কেয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য বর্ণনা করার পরপরই এসেছে, যখন নক্ষত্ররাজি আলোহীন হবে, আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং পর্বতমালা ধুলিকণায় পরিণত হবে। এটি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক অস্বীকারকারীদের প্রতি একটি চূড়ান্ত সতর্কবাণী।

শব্দের গভীরতা

এই আয়াতে ব্যবহৃত শব্দগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী বার্তা বহন করে।

প্রথমেই আসে `وَيْلٌ` (`waylun`) শব্দটি। এর অর্থ হল মহাবিনাশ, দুর্ভোগ বা কঠিন শাস্তি। মুফাসসির আল-যামাখশারী এবং আল-রাযী উল্লেখ করেছেন যে, এই শব্দটি সাধারণত একটি অভিশাপ বা দুর্ভাগ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং ব্যাকরণগতভাবে `نصب` (`nasb`, accusative) অবস্থায় থাকে। কিন্তু এখানে এটি `رفع` (`raf'`, nominative) অবস্থায় এসেছে এবং একটি বাক্যের শুরুতেই `مبتدأ` (`mubtada`, subject) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ব্যাকরণগত পরিবর্তনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, এই শাস্তি বা ধ্বংস একটি ক্ষণস্থায়ী বিষয় নয়, বরং `ثبات الهلاك ودوامه` (বিনাশের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা) বোঝায়। অর্থাৎ, অস্বীকারকারীদের জন্য এই দুর্ভোগ হবে স্থায়ী এবং অবিচ্ছিন্ন। ইবনে আশুর `وَيْلٌ`কে `أشَدُّ السُّوءِ والشَّرِّ` (সবচেয়ে নিকৃষ্ট মন্দ ও ক্ষতি) বলে বর্ণনা করেছেন।

এরপর আসে `يَوْمَئِذٍ` (`yawma'idhin`) শব্দটি, যার অর্থ 'সেই দিন'। এই শব্দটি সময়কে নির্দিষ্ট করে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে যে, এই মহাবিনাশ কোনো সাধারণ দিনে ঘটবে না, বরং নির্দিষ্ট সেই মহা দিবসে, অর্থাৎ কিয়ামতের দিনেই সংঘটিত হবে। আল-জাদওয়াল ফি ই'রাব আল-কুরআন অনুসারে, এখানে `تنوين` (`tanween`, দ্বিবচন) একটি বিস্তারিত বর্ণনাকে প্রতিস্থাপন করে, যেমন "সেই দিন যখন সৃষ্টিকুলের বিচার করা হবে।" এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে বর্ণিত ভয়াবহ ঘটনাবলী যখন ঘটবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই দুর্ভোগ অস্বীকারকারীদের জন্য নির্ধারিত।

সর্বশেষে `لِّلْمُكَذِّبِينَ` (`lil-mukadhdhibeen`) শব্দটি দ্বারা সুস্পষ্টভাবে কারা এই দুর্ভোগের শিকার হবে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে – যারা অস্বীকার করে। আল-রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর দ্বারা আল্লাহর একত্ব, নবুয়ত এবং পুনরুত্থানকে অস্বীকারকারীদের বোঝানো হয়েছে। ইবনে আশুর এর পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে বলেছেন, যারা কুরআন ও পুনরুত্থানকে অবিশ্বাস করে, বিশেষত মক্কার মুশরিকরা, যাদের প্রতি এই সতর্কবাণীগুলো মূলত নির্দেশিত ছিল।

বার্তার প্রভাব

এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচন করা হয়েছে, যা এর অন্তর্নিহিত বার্তাকে আরও তীব্র করে তোলে। `وَيْلٌ` শব্দের মাধ্যমে যে স্থায়ী ও চরম ধ্বংসের চিত্র আঁকা হয়েছে, তা `يَوْمَئِذٍ` দ্বারা কিয়ামতের নির্দিষ্ট দিনের সাথে এবং `لِّلْمُكَذِّبِينَ` দ্বারা অস্বীকারকারীদের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এই আয়াতে শব্দের এই বিন্যাস বার্তাটিকে কেবল একটি সতর্কবাণী হিসেবে নয়, বরং একটি অনিবার্য পরিণতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সূরাতে এই বাক্যটি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, যা অস্বীকারকারীদের পরিণতির নিশ্চিততা এবং ভয়াবহতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। এই আয়াতটি আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শেখায় – আমরা কি সত্যকে মেনে নিয়েছি, নাকি অস্বীকারকারীদের দলে রয়েছি?

সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন