সূরা লুকমান ৩১:১৯

سُورَةُ لُقۡمَانَ · মাক্কী · আয়াত ১৯/৩৪

وَٱقْصِدْ فِى مَشْيِكَ وَٱغْضُضْ مِن صَوْتِكَ ۚ إِنَّ أَنكَرَ ٱلْأَصْوَٰتِ لَصَوْتُ ٱلْحَمِيرِ

অনুবাদ

পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে লুকমান (আলাইহিস সালাম)-এর তাঁর সন্তানকে দেওয়া উপদেশ তুলে ধরেছেন, যা আমাদের সকলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। এখানে শিষ্টাচার, ভারসাম্য এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধার গভীর শিক্ষা নিহিত আছে।

চলার পথে পরিমিতিবোধ

আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে: `وَٱقْصِدْ فِى مَشْيِكَ` (`waqsud fī mashyika`). এখানে `اقصد` (`qasd`) শব্দের অর্থ হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা বা ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া। ইবনে আশুর ও ইমাম রাযী ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর মানে হলো পথচলায় না অতি ধীরগতিতে চলা, যা অহংকার বা অলসতা প্রকাশ করে, আর না অতিরিক্ত দ্রুত বা উদ্ধতভাবে চলা। বরং, এটি একটি শান্ত, সংযত এবং মার্জিত চালচলন। আল-জামাকশারী উল্লেখ করেছেন যে, অতিরিক্ত দ্রুত হাঁটা মুমিনের গাম্ভীর্য বা 'বাহা' (`bahaa`) কমিয়ে দিতে পারে। তাই, পথচলার ক্ষেত্রে বিনয় ও প্রশান্তি বজায় রাখা উচিত।

কণ্ঠস্বরের নিয়ন্ত্রণ

এরপর আল্লাহ বলেন: `وَٱغْضُضْ مِن صَوْتِكَ` (`waghḍud min ṣawtika`). এখানে `اغضض` (`ghaḍḍ`) মানে কণ্ঠস্বর নিচু করা বা সংযত করা। ইবনে আশুর বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এখানে `مِن` (`min`) অক্ষরটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বোঝায় যে সম্পূর্ণ নীরব না হয়ে বরং কণ্ঠস্বরের উচ্চতা বা তীব্রতা 'কিছুটা' কমানো। উদ্দেশ্য হলো ফিসফিস করে কথা বলা নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় উচ্চস্বরের ব্যবহার পরিহার করা। আল-রাযী এই বিষয়ে একটি গভীর ব্যাখ্যা দেন যে, উচ্চস্বরের কথা কেবল বক্তাকেই নয়, শ্রোতাকেও কষ্ট দিতে পারে। মানুষের কান হৃদয়ের দ্বারস্বরূপ, এবং উচ্চশব্দ কান ও হৃদয় উভয়কেই আঘাত করে।

গাধার শব্দের উপমা

আয়াতের শেষাংশে এই নির্দেশের কারণ স্পষ্ট করা হয়েছে: `إِنَّ أَنكَرَ ٱلْأَصْوَٰتِ لَصَوْتُ ٱلْحَمِيرِ` (`inna ankaral aṣwāti laṣawtul ḥamīr`). এখানে `أنكر` (`ankar`) একটি বিশেষণ, যার অর্থ "সবচেয়ে জঘন্য", "সবচেয়ে অপছন্দনীয়" বা "সবচেয়ে বিরক্তিকর"। আল-জালালাইনসহ অধিকাংশ মুফাসসির এই শব্দটিকে প্রাণীজগতের মধ্যে গাধার শব্দের সবচেয়ে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আল-জামাকশারী এবং আল-জাদওয়াল এই তুলনাকে একটি শক্তিশালী রূপক বা `istia'arah` হিসেবে দেখেন, যা উচ্চস্বরে কথা বলার প্রতি চরম ঘৃণা ও নিন্দাকে বোঝায়। ইমাম রাযী আরও ব্যাখ্যা করেন যে, অন্যান্য প্রাণীর শব্দ হয়তো ব্যথা বা ক্লান্তির কারণে হয়, কিন্তু গাধা প্রায়শই অপ্রয়োজনে বা কোনো কারণ ছাড়াই চিৎকার করে, যা এর শব্দকে আরও অপ্রীতিকর করে তোলে। এখানে `الحمير` (বহুবচন) ব্যবহার করা হয়েছে গাধা জাতিকে বোঝানোর জন্য, যেন এই জাতির সমস্ত শব্দের ক্ষেত্রেই এই জঘন্যতা প্রযোজ্য।

এই আয়াতটি আমাদেরকে বিনয়, ভারসাম্য এবং অন্যের প্রতি সম্মান বজায় রেখে জীবনযাপন করার এক মৌলিক শিক্ষা দেয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের জন্যই নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গড়ার জন্যও অপরিহার্য।

সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn, al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)

প্রজ্ঞা

প্রিয় পাঠক, চলুন সূরা লুকমানের ১৯ নম্বর আয়াতের গভীরে প্রবেশ করি, যেখানে আল্লাহ তাআলা লুকমান (আ.) এর তাঁর পুত্রকে দেওয়া অমূল্য উপদেশ তুলে ধরেছেন। এটি শুধু লুকমানের পুত্রের জন্য নয়, বরং আমাদের সকলের জন্য এক গভীর জীবন দর্শন। এই আয়াতে, যিনি কথা বলছেন তিনি আল্লাহ তাআলা, এবং তিনি লুকমানের মাধ্যমে তার পুত্রকে, এবং পরোক্ষভাবে সকল বিশ্বাসীকে, বিনয় ও পরিমিতিবোধের শিক্ষা দিচ্ছেন। এই উপদেশগুলো দৈনন্দিন জীবনে আমাদের আচরণ ও ব্যক্তিত্বকে কীভাবে বিনম্র ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র।

হৃদয়ের স্থিরতা ও শালীন পদক্ষেপ

আয়াতটি শুরু হয়েছে, `وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ` এই কথাটি দিয়ে, যার অর্থ হলো, "আর তোমার চালচলনে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো।" আমাদের হাঁটার ধরণ আমাদের মনের অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আল-কুরতুবী (al-Qurtubi) এবং মুফতি শফি (Mufti Shafi) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর অর্থ হলো, হাঁটার সময় না খুব দ্রুত গতিতে যাওয়া, যেমন চঞ্চল বা দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকেরা করে থাকে, আর না খুব ধীর গতিতে হাঁটা, যেমন অহংকারী বা রুগ্ন ব্যক্তিরা দেখানোর জন্য করে। বরং, হাঁটা হবে শান্ত, স্থির এবং শালীনতাপূর্ণ। মুফতি শফি উমর (রা.) এর দ্রুত কিন্তু উদ্দেশ্যপূর্ণ হাঁটার উদাহরণ দিয়েছেন, যা ছিল জড়তা ও অহংকারমুক্ত। আল-মুনির (al-Munir) এটিকে মধ্যম ও ন্যায়ানুগ হাঁটা (`al-mutawassit al-'adl`) বলেছেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ হাঁটা একজন মুমিনের মর্যাদা (`bahā'` ) প্রকাশ করে এবং আত্মিক বিনয়কে ফুটিয়ে তোলে।

কথায় মাধুর্য, কণ্ঠস্বরে বিনয়

এরপর আল্লাহ বলেন, `وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ`, অর্থাৎ, "এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো।" এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, আমাদের কথা বলার সময় অযথা উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। আল-কুরতুবী এবং মুফতি শফি উল্লেখ করেছেন যে, প্রয়োজন অতিরিক্ত জোরে কথা বলা কষ্টদায়ক এবং এটি অহংকারের লক্ষণ হতে পারে। আল-সাদী (al-Saadi) বলেছেন, এটা মানুষ এবং আল্লাহর প্রতি বিনয়ের নিদর্শন। আল-মুনির (al-Munir) আরও যোগ করেছেন যে, উচ্চ কণ্ঠস্বর শ্রবণের জন্য কষ্টকর এবং এটি অহংকার ও অন্যের প্রতি উদাসীনতা প্রকাশ করে। কণ্ঠস্বরে পরিমিতিবোধ বক্তার জন্য মর্যাদা নিয়ে আসে এবং শ্রোতার জন্য কথা বুঝতে সহজ করে তোলে।

গাধার স্বরের উপমা থেকে শিক্ষা

আয়াতের শেষ অংশটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ: `إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ` অর্থাৎ, "নিশ্চয়ই সবচেয়ে অপ্রীতিকর কণ্ঠস্বর হলো গাধার কণ্ঠস্বর।" আল-কুরতুবী, আল-সাদী এবং আল-মুনির সবাই এই উপমাকে কঠোর নিন্দার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, গাধার শব্দকে সবচয়ে কুরুচিপূর্ণ, বিরক্তিকর ও জঘন্য শব্দ হিসাবে উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অপ্রয়োজনীয় উচ্চস্বরের প্রতি চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। যদি উচ্চস্বরে কোনো উপকার বা মর্যাদা থাকতো, তবে গাধার ডাকই সবচেয়ে সম্মানিত হতো, কিন্তু গাধাকে তার নিম্ন মর্যাদা ও বোকামির জন্য পরিচিত করা হয়। আল-কুরতুবী (al-Qurtubi) উল্লেখ করেন যে, প্রাচীন আরবরা উচ্চ কণ্ঠস্বরকে গর্বের বিষয় মনে করতো, যা এই আয়াত প্রত্যাখ্যান করে। এই শক্তিশালী উপমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কথা বলার ক্ষেত্রে কঠোরতা ও অহংকার আল্লাহ তাআলা এবং মানুষ কারোরই পছন্দ নয়। এটি আমাদের আচরণে আরও বিনয় ও মাধুর্য আনার জন্য এক গভীর শিক্ষা।

এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, আমাদের বাহ্যিক আচরণ, যেমন চলাফেরা এবং কথা বলা, আমাদের ভেতরের বিনয় ও মর্যাদার প্রতিফলন হওয়া উচিত। এটি কেবল ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের উপদেশ নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখার এক চিরন্তন প্রজ্ঞা।

সূত্র: al-Qurtubi (al-Jami li-Ahkam), Ma'arif al-Quran (Mufti Shafi), al-Saadi (Taysir al-Karim), al-Munir (Wahba al-Zuhayli), Ibn al-Jawzi (Zad al-Masir)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ১২টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন