সূরা আল-কাহফ ১৮:৭
سُورَةُ الكَهۡفِ · মাক্কী · আয়াত ৭/১১০
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى ٱلْأَرْضِ زِينَةًۭ لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًۭا
অনুবাদ
আমি পৃথিবীস্থ সব কিছুকে পৃথিবীর জন্যে শোভা করেছি, যাতে লোকদের পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে ভাল কাজ করে।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
পৃথিবী ও তার সৌন্দর্য
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহফের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন: ﴿إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى ٱلْأَرْضِ زِينَةًۭ لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًۭا﴾ (নিশ্চয় আমি পৃথিবীর উপরিভাগে যা কিছু আছে, সেগুলোকে পৃথিবীর জন্য সৌন্দর্যস্বরূপ করেছি, যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কে আমলে উত্তম)। এই আয়াতটি আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক গভীর বার্তা বহন করে। এখানে `إِنَّا` (ইন্না - নিশ্চয়ই আমরা) শব্দটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর ক্ষমতা ও মহিমাকে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন, যেন আমরা বুঝতে পারি যে, এই সব কিছুর স্রষ্টা ও ব্যবস্থাপক তিনিই। এরপর `جَعَلْنَا` (জা'আলনা - আমরা বানিয়েছি বা স্থাপন করেছি) শব্দটি দিয়ে স্পষ্ট হয় যে, পৃথিবীর যাবতীয় সৌন্দর্য যেমন প্রাণী, উদ্ভিদ, নদ-নদী ইত্যাদি তিনিই নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং এর উদ্দেশ্যও তিনিই নির্ধারণ করেছেন। আল-জালালীন ও ইমাম যামাখশারীর তাফসীর অনুযায়ী, এই `زِينَةً` (যীনাহ - সৌন্দর্য) বলতে পৃথিবীর যাবতীয় আকর্ষণীয় ও মন মুগ্ধকারী বিষয়কে বোঝানো হয়েছে, যা একে মনোমুগ্ধকর করে তোলে। ইবনে আশুর ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই সৌন্দর্য মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর অতুলনীয় সৃষ্টিশৈলীর (`بَدِيعِ صُنْعِ اللَّهِ`) স্মারক।
জীবনের আসল পরীক্ষা
আয়াতের মূল উদ্দেশ্য তুলে ধরে আল্লাহ বলছেন: `لِنَبْلُوَهُمْ` (লিনাবলুওয়াহুম - যাতে আমরা তাদের পরীক্ষা করি)। এখানে `لِ` (লি - যাতে) শব্দটি এই `যীনাহ` বা সৌন্দর্যের পেছনের আসল উদ্দেশ্যকে নির্দেশ করে। `নাবলুওয়াহুম` মানে পরীক্ষা করা বা যাচাই করা। ইমাম ইবনে আশুর এবং ইমাম রাযী বলেন যে, এর মানে এই নয় যে, আল্লাহ তাআলা তাদের অবস্থা জানেন না, বরং এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের কর্মগুলো যেন প্রকাশ্যে আসে এবং সত্য-মিথ্যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ সবকিছু আগে থেকেই জানেন, কিন্তু তাঁর পরীক্ষা হলো মানুষের কর্মের মাধ্যমে তাদের যোগ্যতা ও অবস্থানকে প্রকাশ করা। এই পরীক্ষাটি কেবল তাদের জন্য, যারা জীবনের পথ বেছে নেওয়ার জন্য স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি লাভ করেছে।
উত্তম আমলের মানদণ্ড
পরীক্ষার মানদণ্ড বর্ণনা করে আল্লাহ বলছেন: `أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًۭا` (আইয়্যুহুম আহসানু আমালা - তাদের মধ্যে কে আমলে উত্তম)। এখানে শুধু `আমল` (কাজ) এর কথা বলা হয়নি, বরং `আহসান` (উত্তম বা শ্রেষ্ঠ) আমলের কথা বলা হয়েছে। এর মানে হলো, আল্লাহ তাআলা কাজের পরিমাণ নয়, বরং কাজের গুণগত মানকে গুরুত্ব দেন। ইমাম যামাখশারী ও আল-জালালীন ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই উত্তম আমল বলতে পৃথিবীর প্রতি উদাসীনতা (`الزهد فيها`) এবং এর প্রলোভনে ধোঁকা না খাওয়া (`ترك الاغترار بها`) বোঝায়। ইবনে আশুর একে হৃদয়ের আমল (যেমন ঈমান ও কুফর) এবং শারীরিক আমল (যেমন সত্যের অনুসরণ বা বিচ্যুতি) উভয়টির শ্রেষ্ঠত্বের সাথে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও ভোগ-বিলাসের প্রতি অনাসক্তি এবং আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ়তাই হলো এই পরীক্ষার মূল বিষয়।
আমাদের জন্য শিক্ষা
এই আয়াতটি আমাদেরকে স্মরণে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সমস্ত চাকচিক্য, সাজসজ্জা এবং ভোগ সামগ্রীই পরীক্ষার উপকরণ। এর উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে আনন্দ উপভোগ করা নয়। বরং এর মাধ্যমে আল্লাহ দেখতে চান, কে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে, তাঁর আদেশ পালন করে এবং ক্ষণস্থায়ী বস্তুর মোহে আকৃষ্ট না হয়ে চিরস্থায়ী আখিরাতের জন্য উত্তম আমল করে। এই গভীর উপলব্ধি আমাদের অন্তরকে দুনিয়ার প্রতি লোভ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চালিত করতে সাহায্য করে।
সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।