সূরা আল-কাহফ ১৮:৬
سُورَةُ الكَهۡفِ · মাক্কী · আয়াত ৬/১১০
فَلَعَلَّكَ بَٰخِعٌۭ نَّفْسَكَ عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا۟ بِهَٰذَا ٱلْحَدِيثِ أَسَفًا
অনুবাদ
যদি তারা এই বিষয়বস্তুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে, তবে তাদের পশ্চাতে সম্ভবতঃ আপনি পরিতাপ করতে করতে নিজের প্রাণ নিপাত করবেন।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
সূরা কাহফ এর ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, যেখানে নবীজিকে তাঁর কওমের যারা আল্লাহর বাণীতে ঈমান আনছে না, তাদের জন্য অত্যধিক দুঃখ ও কষ্ট না করতে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে। এই আয়াতে প্রতিটি শব্দে গভীর মমতা এবং প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে, যা আমাদেরকে আল্লাহর বার্তার মর্ম আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
অন্তরের গভীর কষ্ট
আল্লাহ বলেন: `فَلَعَلَّكَ بَٰخِعٌۭ نَّفْسَكَ` (ফাল`আল্লাহকা বাখি`উন নাফসাকা), অর্থাৎ, "হয়তো আপনি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবেন।" `باخع` (`bakhi'`) শব্দটি এখানে নিজেকে চরম দুঃখ বা আক্রোশে হত্যা করা বা ধ্বংস করে ফেলা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লামা যামাখশারী ব্যাখ্যা করেছেন যে, নবীর অবস্থা এমন একজন মানুষের মতো, যার প্রিয়জনরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে, আর তিনি তাদের চলে যাওয়ার বেদনায়, তাদের স্মৃতিচিহ্ন আঁকড়ে ধরে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন। এই শব্দচয়ন নবীজির হৃদয়ের গভীর আবেগ ও মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসাকে তুলে ধরে। তাঁর উম্মতের ঈমান না আনার কারণে তাঁর ভেতর কতটা তীব্র কষ্ট কাজ করছিল, আল্লাহ তাআলা সেই কষ্টের গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, যেন তিনি বুঝতে পারেন যে আল্লাহ তাঁর অবস্থা সম্পর্কে অবগত।
তাদের পদচিহ্নের উপর
এরপর বলা হয়েছে: `عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِمْ` (``আলা আছা-রিহিম`), অর্থাৎ, "তাদের পদচিহ্নের উপর।" ইবনে আশুর এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, `آثار` (`aathaar`) বলতে এখানে এমন পদচিহ্ন বা নিদর্শনকে বোঝায় যা কোনো মানুষ চলে যাওয়ার পর পেছনে ফেলে যায়। এর অর্থ হতে পারে যে, মানুষ চলে যাওয়ার পর তাদের স্মৃতিচিহ্ন দেখে যেমন কেউ বিষণ্ন হয়, নবীজিও ঠিক তেমনি তাদের ঈমান না আনার কারণে তাদের চলে যাওয়া বা বিমুখতার চিহ্ন দেখে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন। এটি নবীজির এমন তীব্র মনোনিবেশ এবং চিন্তাকে বোঝায়, যেখানে তিনি যেন তাদের ফেলে যাওয়া পথে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য হাহাকার করছেন।
এই বার্তা
আয়াতে `بِهَٰذَا ٱلْحَدِيثِ` (`বিহা-যাল হাদীছি`) বলা হয়েছে, যার অর্থ "এই বার্তা বা বাণীর কারণে"। এখানে `الحديث` (`al-Hadeeth`) দ্বারা কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনে আশুর এর ভাষ্যমতে, কুরআনকে `الحديث` বলা হয়েছে কারণ এটি আল্লাহর কাছ থেকে আসা এক নতুন বার্তা বা খবর, যা মানুষের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা ও গল্প নিয়ে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে কুরআন একটি জীবন্ত, সক্রিয় বার্তা যা মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
তীব্র মনোকষ্টে
সবশেষে, `أَسَفًا` (`আসাফান`) শব্দটি যোগ করা হয়েছে, যার অর্থ "তীব্র মনোকষ্টে বা দুঃখের কারণে।" এটি `باخع نفسك` (`bakhi'un nafsaka`) শব্দটির কারণ হিসেবে এসেছে, অর্থাৎ নবীজি এই চরম আত্মপীড়ন করছেন তাঁর তীব্র দুঃখের কারণে। আল-রাযী ব্যাখ্যা করেন যে `الأسف` (`al-Asaf`) হলো অত্যধিক দুঃখ বা বেদনার প্রকাশ।
এই শব্দগুলো ব্যবহার করে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, তাঁর গভীর দুঃখকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন এবং একইসাথে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর কাজ হলো কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়া, হিদায়াত দেওয়া আল্লাহর হাতে। এই আয়াত আমাদের জন্যও একটি শিক্ষা যে, অন্যদের ঈমানের জন্য আমাদের আন্তরিক চেষ্টা ও উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, তাদের পরিণতি নিয়ে অহেতুক কষ্ট বা মানসিক পীড়ন আমাদের নিজেদের ক্ষতি করতে পারে।
সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৪টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।