সূরা ইউনুস ১০:৩
سُورَةُ يُونُسَ · মাক্কী · আয়াত ৩/১০৯
إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍۢ ثُمَّ ٱسْتَوَىٰ عَلَى ٱلْعَرْشِ ۖ يُدَبِّرُ ٱلْأَمْرَ ۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعْدِ إِذْنِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمْ فَٱعْبُدُوهُ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
অনুবাদ
নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ যিনি তৈরী করেছেন আসমান ও যমীনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পাবে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া ইনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তোমরা কি কিছুই চিন্তা কর না ?
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
সূরা ইউনুসের ৩ নম্বর আয়াতটি মুশরিকদের (যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অংশীদার করে) উদ্দেশ্য করে আল্লাহর একত্ববাদ, তাঁর ক্ষমতা ও মহত্ত্বের এক জোরালো ঘোষণা। এটি নিছক তথ্য নয়, বরং অন্তরকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি আহ্বান, যেন আমরা আমাদের সত্ত্বার গভীরে আল্লাহর পরিচয় খুঁজে পাই।
আল্লাহর পরিচয়
আয়াতটি শুরু হয়েছে `إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ` (ইন্না রাব্বাকুমুল্লাহু – নিশ্চয়ই তোমাদের রব হলেন আল্লাহ) শব্দগুচ্ছ দিয়ে। এখানে `إنَّ` (ইন্না – নিশ্চয়ই) শব্দটি একটি শক্তিশালী নিশ্চয়তা প্রকাশ করে। ইবন আশুর (Ibn Ashur) বলেছেন, এটি আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ হিসেবে আনা হয়েছে, যা সেই মুশরিকদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে, যারা নবী (সা.)-এর দাওয়াতকে জাদু বলেছিল কারণ এটি তাদের দেব-দেবীকে বাতিল করেছিল। আল্লাহ হলেন `ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍۢ` (আল্লাযী খালাকাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা ফী সিত্তাতি আইয়্যামিন – যিনি আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন)। এই 'ছয় দিন' উল্লেখ করা হয়েছে যেন সৃষ্টিকর্তার বিশাল ক্ষমতাকে উপলব্ধি করা যায়, যদিও আল্লাহ মুহূর্তের মধ্যেই সব কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম। এটি তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা এবং কাজ করার ধীরস্থিরতা প্রকাশ করে, যা মানুষের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।
মহাবিশ্বের ব্যবস্থাপনা
`ثُمَّ ٱسْتَوَىٰ عَلَى ٱلْعَرْشِ` (ছুম্মাসতাওয়া 'আলাল আরশি – অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হলেন)। `ثم` (ছুম্মা – অতঃপর) শব্দটি একটি কালক্রমিক বা পর্যায়ক্রমিক অর্থ বোঝায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর আরশের উপর আল্লাহর এই `ইস্তিওয়া` (সমুন্নত হওয়া) সংঘটিত হয়েছে, যা তাঁর মহত্ত্ব ও ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রকাশ। যেমনটি আয়াত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এটি এমনভাবে সমুন্নত হওয়া যা তাঁর মহত্ত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে মানানসই। ইবন আশুর উল্লেখ করেছেন, `يُدَبِّرُ ٱلْأَمْرَ` (য়ুদাব্বিরুল আমরা – তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন) বাক্যটি আল্লাহর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। `تدبير` (তাদবীর – ব্যবস্থাপনা) শব্দটির অর্থ হলো কোনো কাজের ফলাফল ও পরিণতি বিবেচনা করে নিখুঁত পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা। `الأمْرَ` (আল-আমর – সকল বিষয়) একটি ব্যাপক শব্দ, যা মহাবিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতা কতটা পরিপূর্ণ। এই শব্দচয়ন মুশরিকদের সেই দেব-দেবীদের বিরুদ্ধে এক প্রচ্ছন্ন জবাব, যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না বা কোনো কিছু সম্পর্কে জানে না।
শাফায়াত ও ক্ষমতা
এরপর আসে `مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعْدِ إِذْنِهِۦ` (মা মিন শাফী'ইন ইল্লা মিন বা'দি ইযনিহি – তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশকারী কেউ নেই)। এখানে `ما من` (মা মিন – কোনোই নেই) নেতিবাচক শব্দগুচ্ছ দিয়ে সুপারিশের বিষয়টিকে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। এটি একটি জোরদার প্রত্যাখ্যান সেই ধারণার প্রতি, যেখানে মুশরিকরা মনে করত তাদের দেব-দেবী আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবে। যামাখশারী (al-Zamakhshari) এবং ইবন আশুর উভয়ই জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটি আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রমাণ। `إِلَّا مِنۢ بَعْدِ إِذْنِهِۦ` (ইল্লা মিন বা'দি ইযনিহি – কেবল তাঁর অনুমতির পরেই) এই অংশটি একটি সতর্কতামূলক সংযোজন, যা এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, কিয়ামতের দিনে নবী (সা.)-এর মতো যারা সুপারিশ করবেন, তা আল্লাহর পূর্বানুমতি সাপেক্ষেই হবে।
উপসংহার ও আহ্বান
আয়াতের শেষে বলা হয়েছে `ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمْ فَٱعْبُدُوهُ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ` (যালিকুমুল্লাহু রাব্বুকুম ফা'বুদূহু, আফালা তাযাখখারুন – তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব, অতএব তাঁরই ইবাদত করো। তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?)। `ذَٰلِكُمُ` (যালিকুম – ইনিই) এই ইশারা পদটি পূর্বোক্ত সমস্ত গুণাবলী সম্পন্ন আল্লাহর দিকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, যেন তাঁর মহত্ত্ব ও ক্ষমতাকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরা হয়। `فاعبدوه` (ফা'বুদূহু – অতএব তাঁরই ইবাদত করো) এই নির্দেশটি পূর্বে বর্ণিত আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের সরাসরি ফল। ইবন আশুর ব্যাখ্যা করেছেন, `أَفَلَا تَذَكَّرُونَ` (আফালা তাযাখখারুন – তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?) বাক্যটি একটি তিরস্কারের ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা। `تَذَكَّرُونَ` (তাজাক্কারুন – স্মরণ করা বা উপদেশ গ্রহণ করা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে `تتفكّرون` (তাতাফাক্কারুন – গভীরভাবে চিন্তা করা) এর পরিবর্তে, কারণ ইবন আশুর ও আল-রাযী (al-Razi) বলেছেন যে আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ মানুষের ফিতরাত (সহজাত প্রকৃতি) এবং পূর্ববর্তী দাওয়াতের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে কেবল একটু স্মরণ বা মনোযোগই তাদের জন্য যথেষ্ট, যাতে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে।
সূত্র: Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৪টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।