সূরা আল-ইনসান ৭৬:১৬

سُورَةُ الإِنسَانِ · মাদানী · আয়াত ১৬/৩১

قَوَارِيرَا۟ مِن فِضَّةٍۢ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًۭا

অনুবাদ

রূপালী স্ফটিক পাত্রে, পরিবেশনকারীরা তা পরিমাপ করে পূর্ণ করবে।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

জাগতিক আয়না

সূরা আল-ইনসান, আয়াত ১৬, আমাদের জান্নাতের এক সূক্ষ্ম অথচ মহিমান্বিত চিত্রের দিকে তাকানোর সুযোগ করে দেয়: قَوَارِيرَا۟ مِن فِضَّةٍۢ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًۭا (কাওয়ারীরা মিন ফিদ্দাতিন ক্বাদ্দারূহা তাকদীরান)। এই আয়াতটি, এর পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর সাথে, জান্নাতে যারা `আবরার` (পুণ্যবান) তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা যে অসাধারণ পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন, তারই অংশ। এটি বর্ণনা করে যে, তাদের জন্য পরিবেশিত পানীয়ের পাত্রগুলো কেমন হবে। আল্লাহ নিজেই কথা বলছেন, জান্নাতের সুখ-সমৃদ্ধির বিবরণ দিচ্ছেন।

আয়াতের মূল বার্তা

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, পুণ্যবানদের জন্য পরিবেশিত পানীয়ের পাত্রগুলো হবে রূপার কাঁচের মতো, অর্থাৎ `قَوَارِيرَا مِن فِضَّةٍ` (রূপার তৈরি কাঁচের পাত্র)। এটা আমাদের দুনিয়ার কাঁচ বা রূপার মতো নয়, বরং এমন এক বিশেষ সৃষ্টি যা কাঁচের স্বচ্ছতা এবং রূপার আভিজাত্য উভয়ই ধারণ করে। সাইয়্যেদ কুতুব এবং আল-মুনি’র মতো তাফসীরবিদরা এই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন যে, এই ধরনের বস্তু দুনিয়ায় বিদ্যমান নেই। এরপর বলা হয়েছে, `قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًۭا` (সেগুলো তাদের জন্য পরিমাপমতো তৈরি করা হয়েছে)। এর অর্থ হলো, জান্নাতের খাদেমরা পানকারীদের ইচ্ছানুযায়ী এমন নিখুঁত পরিমাপে পাত্রগুলি পূর্ণ করবেন যে, পানীয়তে না থাকবে কোনো বাড়তি অংশ, না কোনো ঘাটতি। ইবনে আল-জাওযি এবং আল-মুনি’র উভয়ই এই পরিপূর্ণতা এবং সন্তুষ্টির উপর আলোকপাত করেছেন, যা পানীয়কে সর্বাধিক উপভোগ্য করে তোলে।

নাফসের উপর প্রতিফলন

এই আয়াতে বর্ণিত জান্নাতের অতুলনীয় সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা আমাদের নিজেদের ভেতরের জগতে গভীর ছাপ ফেলে। প্রথমত, এটি আল্লাহ তায়ালার অতুলনীয় ক্ষমতা ও অনুগ্রহের প্রতি আমাদের হৃদয়কে কৃতজ্ঞতায় ভরে তোলে। যিনি এত সূক্ষ্মতা ও যত্ন সহকারে তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য পুরস্কার প্রস্তুত করেন, তাঁর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা সীমাহীন হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, এটি আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং পুণ্যের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। যদি আল্লাহ তায়ালা কেবল পানীয়ের পাত্রের জন্য এত কল্পনাতীত সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার ব্যবস্থা করেন, তাহলে জান্নাতের অন্যান্য নেয়ামত বা নেয়ামতসমূহ কতটা বিস্ময়কর হবে! এটি আমাদের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ও ত্রুটিপূর্ণ আনন্দের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সুখের দিকে মনোনিবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে

দুনিয়ার জীবনে আমরা প্রায়শই নিখুঁত বস্তু বা অভিজ্ঞতার অন্বেষণে থাকি, যা প্রায়শই অধরা থেকে যায়। এই আয়াতটি দুনিয়াবী আকাঙ্ক্ষা এবং জান্নাতের চূড়ান্ত পরিপূর্ণতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে। সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমরা প্রায়শই বস্তুগত আভিজাত্য এবং ভোগবিলাসের পেছনে ছুটি, যা কখনো পূর্ণ সন্তুষ্টি দেয় না। `قَوَارِيرَا مِن فِضَّةٍ` (রূপার কাঁচ) এর বর্ণনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আসল পরিপূর্ণতা এবং সৌন্দর্য কেবলমাত্র আল্লাহর তৈরি জান্নাতেই সম্ভব, যা আমাদের দুনিয়াবী ধারণাকে ছাড়িয়ে যায়। এটি `আবরার` (পুণ্যবান)দের জন্য একটি নির্দিষ্ট পুরস্কারের কথা বলছে, যা সমাজে সততা, ধৈর্য এবং আল্লাহর আনুগত্যের মূল্যবোধকে তুলে ধরে। এটি আমাদের জন্য আশা এবং অনুপ্রেরণার উৎস, যা আমাদেরকে একটি উন্নত ও ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠনের জন্য প্রচেষ্টা করতে উৎসাহিত করে, এই বিশ্বাসে যে আমাদের প্রতিটি ভালো কাজের জন্য চূড়ান্ত পুরস্কার আল্লাহ তায়ালার কাছে অপেক্ষমাণ।

সূত্র: Israr Ahmad (Bayan ul Quran), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), Tazkirul Quran, al-Munir (Wahba al-Zuhayli), Ibn al-Jawzi (Zad al-Masir)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৩টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন