সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৪২

سُورَةُ الذَّارِيَاتِ · মাক্কী · আয়াত ৪২/৬০

مَا تَذَرُ مِن شَىْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ إِلَّا جَعَلَتْهُ كَٱلرَّمِيمِ

অনুবাদ

এই বায়ু যার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিলঃ তাকেই চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দিয়েছিল।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

শব্দশৈলী

সূরা ৫১, আয়াত ৪২ - `مَا تَذَرُ مِن شَىْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ إِلَّا جَعَلَتْهُ كَٱلرَّمِيمِ` (মা তাযারু মিন শাইয়িন আতাত 'আলাইহি ইল্লা জা'আলাতহু কার-রামিম)। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আদ জাতির উপর আপতিত সর্বগ্রাসী বাতাসের বর্ণনা দিচ্ছেন। আমরা বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে আল্লাহর এই কালামের গভীরে প্রবেশ করি, যা আমাদের জন্য এক গভীর শিক্ষা বহন করে।

বাতাসের বর্ণনা

আল্লাহ তাআলা বলছেন যে, তিনি আদ জাতির উপর এক বন্ধ্যা বাতাস (`الريح العقيم` - `ar-reeh al-'aqeem`) প্রেরণ করেছিলেন, যার মধ্যে কোনো কল্যাণ ছিল না। এই আয়াতে বলা হচ্ছে, "তা (সেই বাতাস) এমন কোনো কিছু ছাড়েনি, যার উপর দিয়ে তা প্রবাহিত হয়েছে, তাকে জীর্ণশীর্ণ বস্তুর মতো না করে।" এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদ জাতির জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা ও পরিণতি, যারা তাদের নবীর কথা অস্বীকার করেছিল।

শব্দের প্রাণবন্ততা

আয়াতটিতে `مَا تَذَرُ` (`ma tadharu`) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ "তা ছাড়েনি"। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এখানে অতীতকালের পরিবর্তে বর্তমানকালের ক্রিয়াপদ (`مضارع` - `mudari'`) ব্যবহার করা হয়েছে। আল-রাযি (রহ.) এবং ইবনে আশুর (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই ব্যবহারটি একটি আশ্চর্যজনক ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন তা এখনই ঘটছে বা পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে। এটি শুধু একটি অতীত ঘটনাকে জানানো নয়, বরং সেই ধ্বংসের ভয়াবহতা ও তাৎক্ষণিকতা অনুভব করানোর জন্য। এই শব্দচয়ন আল্লাহর শক্তির সেই চিত্র তুলে ধরে, যা সময়ের বাধা পেরিয়ে চিরন্তন।

সর্বাত্মক ধ্বংসের চিত্র

আল্লাহ আরও বলেছেন, `مِن شَىْءٍ أَتَتْ عَلَيْهِ` (`min shayin atat 'alayhi`), অর্থাৎ "কোনো জিনিস যা এর সামনে এসেছে"। এখানে `مِن` (`min`) শব্দটি "কোনো" শব্দের আগে এসে সার্বজনীনতা এবং জোর প্রকাশ করে। ইবনে আশুর (রহ.) উল্লেখ করেন যে, এই `مِن` এর ব্যবহার নঞর্থক বাক্যকে আরও জোরালো করে, বোঝায় যে কোনো কিছুই এর প্রভাব থেকে বাদ যায়নি। তবে, আল-রাযি (রহ.) এবং ইবনে আশুর (রহ.) এও ব্যাখ্যা করেন যে, এই "সবকিছু" বলতে সেই বস্তুগুলো বোঝানো হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবে বাতাস দ্বারা ধ্বংস হতে পারে, যেমন আদ জাতির ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং তারা নিজেরা। বাতাস পাহাড় বা সমুদ্রকে ধ্বংস করে না, তবে যা কিছু তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি ছিল, তা ধ্বংস করে দিয়েছিল।

আর এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো `إِلَّا جَعَلَتْهُ كَٱلرَّمِيمِ` (`illa ja'alat-hu kar-rameem`) - "তাকে পচা-গলা, জীর্ণ-শীর্ণ বস্তুর মতো করে দিয়েছে।" `الرميم` (`ar-rameem`) শব্দটি এমন কিছুকে বোঝায় যা সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়প্রাপ্ত, পচে গেছে বা টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, যেমন পচা হাড় বা ধূলিসাৎ হওয়া ধ্বংসাবশেষ। এই নির্দিষ্ট শব্দটির ব্যবহার বাতাসের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে পরিষ্কার করে তুলে ধরে, যা সবকিছুকে এতটাই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল যে, তা কেবল জীর্ণ ও পচাগলা বস্তুর ন্যায় হয়ে যায়।

আমাদের জন্য শিক্ষা

এই আয়াতের শব্দগুলো থেকে আমরা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব অনুভব করি। যে বাতাস জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য, আল্লাহর নির্দেশে তা সর্বনাশী রূপ ধারণ করতে পারে। এই শক্তিশালী বর্ণনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর সতর্কবাণীকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। আদ জাতির ধ্বংস আমাদের জন্য এক চিরন্তন বার্তা যে, যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে এবং তাঁর নবীদের অস্বীকার করে, তাদের পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। এই আয়াতে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ যেন সেই ধ্বংসের চিত্র আমাদের হৃদয়ে গেঁথে দেয়, যা থেকে আমরা গভীর শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতে পারি।

সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Razi (Mafatih al-Ghayb), al-Jalalayn, al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir)

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৪টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন