সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯

سُورَةُ الأَحۡزَابِ · মাদানী · আয়াত ৫৯/৭৩

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا

অনুবাদ

হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।

বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।

অর্থ ও উপলব্ধি

জাগতিক আয়না

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল, মুহাম্মদ (সা)-কে সম্বোধন করে সকল বিশ্বাসী নারী, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অপরিহার্য।

কাদের জন্য এই নির্দেশনা?

আল্লাহ তাআলা সরাসরি নবী মুহাম্মদ (সা)-কে নির্দেশ দিচ্ছেন (`يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ`), অর্থাৎ "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলুন।" এই আয়াতে প্রথমে নবীর পরিবারের সদস্যদের উল্লেখ করা হয়েছে কারণ একজন নেতার পরিবারই সমাজের জন্য আদর্শ স্থাপন করে। আল-মুনির (ওয়াহবা আল-জুহায়লি) উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো দাওয়াত তার নিজের ও পরিবারের থেকে শুরু হয়, তখনই তা ফলপ্রসূ হয়। এরপর সমস্ত মুমিন নারীদের জন্য এই নির্দেশ আসে।

جَلَابِيبِهِنَّ (`Jalābeebihinna`) কী?

আয়াতে বলা হয়েছে `يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ`, যার অর্থ "তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়।" `جلباب` (`Jilbab`) হলো একটি বড় চাদর বা ওড়না যা পোশাকের উপর পরিধান করা হয় এবং পুরো শরীর আবৃত করে, যেমনটা ইসরার আহমদ (বায়ানুল কুরআন) ব্যাখ্যা করেছেন। এটি ছোট ওড়না বা `خمار` (`khimar`) থেকে ভিন্ন, যা সাধারণত মাথার উপর নেওয়া হয়। এই `جلباب` এমনভাবে পরা হতো যাতে তা মুখমণ্ডল এবং বুকের বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রাখে। ইবনে আব্বাস ও উবায়দা আল-সালমানীর মতো কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, এটি এমনভাবে টানা হতো যেন শুধু একটি চোখ খোলা থাকে, আবার অন্য বর্ণনায় এসেছে যে তা অর্ধেক মুখ ঢাকত, যেমন হাসান আল-বসরী বলেছেন (আল-মুনির)।

কেন এই আদেশ?

এই নির্দেশের পেছনে সমাজের নারীদের সুরক্ষা এবং সম্মান নিশ্চিত করার একটি গভীর প্রজ্ঞা নিহিত আছে। আল্লাহ বলেছেন, `ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ` – "এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের বিরক্ত করা হবে না।" সাঈদ কুতুব (ফি জিলালিল কুরআন) এবং ইসরার আহমদ উভয়েই বলেছেন যে, মদিনায় সে সময় কিছু লম্পট ও মুনাফিক প্রকৃতির লোক ছিল, যারা রাতে বের হওয়া নারীদের উত্ত্যক্ত করত। মুক্ত নারীরা এবং দাসীরা তখন প্রায় একই রকম পোশাক পরতেন, ফলে লম্পটরা দাসী মনে করে মুক্ত নারীদেরও বিরক্ত করত।

এই আয়াতে `جلباب` পরিধানের মাধ্যমে বিশ্বাসী নারীদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দিত যে, এই নারী একজন সম্ভ্রান্ত, স্বাধীন ও মুসলিম নারী, যিনি স্রেফ প্রয়োজনে বাইরে এসেছেন, কোনো ধরনের আমোদ-প্রমোদের উদ্দেশ্যে নন। এই পোশাকের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে মন্দ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানুষের থেকে আলাদা করতে পারতেন এবং এর ফলে তাদের প্রতি কোনো কুদৃষ্টি বা বিরক্তিকর আচরণ করার সাহস কমে যেত। এটি সমাজকে অশ্লীলতা ও ফিতনা থেকে রক্ষা করার একটি উপায় ছিল, যেমন আল-মুনির উল্লেখ করেছেন।

ক্ষমা ও অনুগ্রহ

আয়াতটি শেষ হয়েছে এই বলে: `وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا` – "আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" এর অর্থ হলো, ইসলাম পূর্ববর্তী অজ্ঞতার যুগে নারীরা নিজেদের পোশাকের ব্যাপারে যে শিথিলতা দেখিয়েছেন, আল্লাহ তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন তাদের জন্য সহজ এবং কল্যাণকর পথ পরিষ্কার করে দিয়েছেন, যা তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে (আল-মুনির, সাঈদ কুতুব)। এটি আল্লাহর দয়া যে তিনি কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা এবং কল্যাণের পথও দেখিয়েছেন। এই আয়াত আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ আমাদের ভালো চান এবং তাঁর দেওয়া বিধান আমাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সামাজিক শান্তির জন্য অপরিহার্য।

সূত্র: al-Munir (Wahba al-Zuhayli), Ibn al-Jawzi (Zad al-Masir), Sayyid Qutb (Fi Zilal al-Quran), Israr Ahmad (Bayan ul Quran), Tazkirul Quran

যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত

এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।

কুরআনের সব বিষয় দেখুন

আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন

Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।

Maani-তে এই আয়াত নিয়ে চিন্তা করুন