সূরা আল-কাহফ ১৮:১২
سُورَةُ الكَهۡفِ · মাক্কী · আয়াত ১২/১১০
ثُمَّ بَعَثْنَٰهُمْ لِنَعْلَمَ أَىُّ ٱلْحِزْبَيْنِ أَحْصَىٰ لِمَا لَبِثُوٓا۟ أَمَدًۭا
অনুবাদ
অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে।
বাংলা অনুবাদ: মুহিউদ্দীন খান।
অর্থ ও উপলব্ধি
শব্দশৈলী
সুরা কাহফ-এর এই আয়াতে, আল্লাহ তায়ালা আহলে কাহফ (গুহাবাসীদের) দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার কথা বলছেন। এই আয়াতটি যখন আমরা শব্দ ধরে ধরে চিন্তা করি, তখন এর গভীর বার্তাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এক জাগরণ
আয়াতটি শুরু হয়েছে, "ثُمَّ بَعَثْنَٰهُمْ" (`thumma ba'athnaahum`), যার অর্থ "তারপর আমরা তাদেরকে জাগিয়ে তুললাম।" এখানে 'بعثنا' (`ba'athna`) শব্দটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এর সাধারণ অর্থ 'জাগিয়ে তোলা' বা 'পুনরুত্থিত করা', ইবন আশুর (Ibn Ashur) বলেছেন, এখানে এটি একটি শক্তিশালী রূপক অর্থ বহন করে। গুহাবাসীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলাকে কেয়ামতের দিন মৃতদের পুনরুত্থানের একটি ছোট দৃষ্টান্ত হিসেবে বোঝানো হয়েছে। এই শব্দচয়নের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা গল্পের অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের মৃত্যুর পরের জীবনের সম্ভাবনা এবং ধরন সম্পর্কে ভাবনার খোরাক দিচ্ছেন।
জ্ঞানের প্রকাশ
এরপর বলা হয়েছে, "لِنَعْلَمَ" (`lina'lama`) - "যেন আমরা জানতে পারি।" আল-জালালীন (al-Jalalayn) এবং অন্যান্য তাফসীরবিদগণ স্পষ্ট করেছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহ তায়ালা নতুন কিছু শিখবেন, কারণ তাঁর জ্ঞান চিরন্তন ও অসীম। আল-জামাখশারী (al-Zamakhshari) এবং আল-রাযী (al-Razi) ব্যাখ্যা করেছেন যে, "لِنَعْلَمَ" (`lina'lama`) এর উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা আযল (অনাদি কাল) থেকে যা জানেন, তা মানুষের কাছে বাস্তবে প্রকাশ করা। অর্থাৎ, ঘটনার মাধ্যমে সত্যকে উন্মোচন করা, যাতে মানুষ তা দেখে বিশ্বাস ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এই শব্দগুলো আসলে মানুষের জন্য একটি নিদর্শন হিসেবে ঘটনাটির উদ্ঘাটনকে ইঙ্গিত করে, যেন তারা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা লাভ করে এবং আল্লাহর ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারে।
দুই দলের বিতর্ক
আয়াতে বলা হয়েছে, "أَىُّ ٱلْحِزْبَيْنِ" (`ayyul hizbayni`) - "দুটি দলের মধ্যে কোনটি।" এই 'দুটি দল' কারা ছিলেন তা নিয়ে তাফসীরবিদদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ (যেমন মুজাহিদ এবং আল-রাযী) বলেছেন যে এটি গুহাবাসীদের নিজেদের ভেতরের দুটি দল ছিল, যারা জেগে ওঠার পর তাদের ঘুমের সময়কাল নিয়ে মতভেদ করেছিল। আবার ইবন আশুর (Ibn Ashur) সহ অন্য অনেকে মনে করেন যে, এটি সেই শহরের সাধারণ মানুষদের দুটি দল ছিল, যারা গুহাবাসীদের ঘুমের সময়কাল নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দচয়ন বিতর্কের অস্তিত্ব এবং সত্যকে স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।
সময়ের নির্ভুল হিসাব
অবশেষে, আয়াতে বলা হয়েছে, "أَحْصَىٰ لِمَا لَبِثُوٓا۟ أَمَدًۭا" (`ahsaa limaa labithoo amadaa`) - "তাদের অবস্থানকালের মেয়াদ সম্পর্কে অধিক সঠিক হিসাব দিতে পেরেছিল।" 'أحصى' (`ahsaa`) শব্দটি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত আলোচনা তৈরি করেছে। কিছু ভাষাবিদ একে একটি ক্রিয়াপদ হিসেবে দেখেছেন যার অর্থ 'তিনি গণনা করেছিলেন'। তবে অধিকাংশ তাফসীরবিদ (যেমন আল-জালালীন, ইবন আশুর, আল-জাদওয়াল) এটিকে 'আফআলুত তাফদীল' (সুপারলেটিভ ফর্ম) হিসেবে দেখেন, যার অর্থ 'অধিক সঠিক' বা 'অধিক নির্ভুল'। ইবন আশুর এর অর্থ করেছেন `أَتْقَنُ إِحْصَاءً` (গণনায় সর্বাধিক নির্ভুল)। এই শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কুরআনে যে সত্যের নির্ভুলতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়। আল্লাহ তায়ালা এই ঘটনাকে উন্মোচন করেছেন যেন মানুষের সামনে সময়ের হিসেবের ক্ষেত্রে কে সর্বাধিক নির্ভুল ছিল, তা পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এই অলৌকিক ঘটনা থেকে মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে।
এই আয়াতের প্রতিটি শব্দই গভীর অর্থ বহন করে, যা শুধু গুহাবাসীদের গল্প নয়, বরং আমাদের জীবন ও পুনরুত্থান সম্পর্কেও মূল্যবান শিক্ষা দেয়।
সূত্র: al-Zamakhshari (al-Kashshaf), al-Jalalayn, al-Razi (Mafatih al-Ghayb), Ibn Ashur (al-Tahrir wa al-Tanwir), al-Jadwal fi I'rab al-Quran (Mahmud Safi)
যেসব বিষয়ে এই আয়াত আলোচিত
এই আয়াতটি Maani-র ৭টি বিষয়ভিত্তিক স্টাডি গাইডে আলোচিত হয়েছে (গাইডগুলো ইংরেজিতে)।
আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করুন
Maani-তে আয়াতটি পাঁচটি লেন্সে ভাবুন: এর শব্দচয়ন, প্রেক্ষাপট, আপনার জীবনে এর অর্থ, কুরআনের অন্য আয়াতের সঙ্গে সংযোগ এবং এর শিক্ষা, ক্লাসিক তাফসীরের ভিত্তিতে।